বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা জরুরি পদক্ষেপ প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেছেন, এখন সহমর্মিতা থেকে মূল কারণ অনুসন্ধান ও সমাধানের দিকে, প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫) স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: অ্যা রিনিউড কল ফর অ্যা ডিউরেবল সলিউশন টু প্রট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সহ-আয়োজক ও অন্যান্য অংশীদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা চরম বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় বড় ঢল এসেছে। ১৯৮০-এর দশকেও কয়েক দফা আগমন ঘটে। তবে ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তবে শিবিরগুলো দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের উপযোগী আদর্শ স্থান নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপরও তীব্র প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, "মানবিক উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই দায়ভার বহন করবে এমনটাও প্রত্যাশা করা যায় না।"
মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়নে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাব:
প্রথম প্রস্তাব: আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা করতে হবে এবং তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব: রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান।
তৃতীয় প্রস্তাব: রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা বজায় রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের প্রতি উদার আতিথেয়তার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।
চতুর্থ প্রস্তাব: টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
পঞ্চম প্রস্তাব: আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।" রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং নিরাপত্তাহীনতাসহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।"
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। মিয়ানমারে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন কেবল নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে; বরং এটি যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে। এই গল্পের সূচনা হোক এখনই।"
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, গাম্বিয়ার উপরাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ বি. এস. জালো, মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশনার হাদজা লাহবিব, সৌদি আরবের কিং সালমান হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারের সুপারভাইজার জেনারেল আবদুল্লাহ আল-রাবিয়াহ, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ওআইসি, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।
বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান। নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে উচ্চপর্যায়ের এ ...
চট্টগ্রাম অফিস: পানি সম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, চট্টগ্রাম জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নত করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর ...
স্টাফ রিপোর্টার: জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জেরে বাসের পর এবার বাড়ল লঞ্চের ভাড়া। লঞ্চের নতুন ভাড়া বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকেই কার্যকর। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যাত্রীবাহী লঞ্চে প্রথম ১০০ ...
স্টাফ রিপোর্টার: বাস-মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটার ১৭ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এ সংক ...
সব মন্তব্য
No Comments