বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক অভিষেক

প্রকাশ : 24 Sep 2026
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক অভিষেক

জাতিসংঘে জিয়া পরিবারের তিন অধ্যায় :আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার থেকে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা—বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বিবর্তন


কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল।।


১৯৮০ থেকে ২০২৬—সময়ের হিসাবে ৪৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ যেমন অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির বাস্তবতাও। এই সময়ের ব্যবধানে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন একই পরিবারের তিন সদস্য—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনটি সময়, তিনটি ভিন্ন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের সামনে থাকা ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার—সব মিলিয়ে এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই বক্তব্য হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তাঁর প্রথম ভাষণ এবং একই পরিবারের তৃতীয় সদস্যের উপস্থিতি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।


১৯৮০: জিয়াউর রহমানের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের বার্তা


১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বক্তব্য দেন। এটি বাংলাদেশের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক মুহূর্ত। ১৯৮০ সালের সেই বিশেষ অধিবেশনের আলোচনায় মূলত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বৈষম্য এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছিল। জিয়াউর রহমান তাঁর বক্তব্যে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।তিনি শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে বিশ্বকে কেবল ধনী ও দরিদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দেখার পরিবর্তে পারস্পরিক দায়িত্ব ও সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রগতি, বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরতা, শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।


অর্থাৎ, চার দশকেরও বেশি আগে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল, তার অনেকগুলো আজও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে—বিশেষ করে বৈশ্বিক বৈষম্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার।


১৯৯৩: খালেদা জিয়ার ভাষণে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও পানির অধিকার


জিয়াউর রহমানের ভাষণের ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ।


১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক ধারায় নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ফলে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন ছিল তখনকার জাতীয় বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালেদা জিয়ার ভাষণে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্ব পায়।


তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা ও ফারাক্কা-সংক্রান্ত প্রশ্নও আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হয়। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক ফোরামে খালেদা জিয়া গঙ্গার পানিবণ্টন ও ফারাক্কা ইস্যুকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ১৯৯৫ সালের জাতিসংঘের এক বক্তব্যে তিনি গঙ্গার পানির প্রবাহ ও ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।


১৯৯৩ সালের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা। ফলে তাঁর সময়ের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের পানি-স্বার্থ বিশেষ গুরুত্ব পায়।


২০২৬: তারেক রহমানের সামনে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা


২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক কূটনীতির চ্যালেঞ্জের ধরন অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


এই প্রেক্ষাপটে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।


এবারের অধিবেশনের একটি বিশেষ দিক হলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২ জুন ২০২৬ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়।


ফলে বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের জাতিসংঘ অধিবেশন একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কূটনীতি, বহুপাক্ষিক নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।


৪৬ বছরে বাংলাদেশের  কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বিবর্তন:


১৯৮০, ১৯৯৩ এবং ২০২৬—এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বিবর্তনও স্পষ্ট হয়।জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শান্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খালেদা জিয়ার সময় গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং পানি-সম্পদের ন্যায্য ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে আসে। আর ২০২৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে।


তবে সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু বিষয় ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়—উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায়সংগত বৈশ্বিক ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা।

এখানেই ৪৬ বছরের এই ধারাবাহিকতার মূল তাৎপর্য। মঞ্চ একই হলেও সময়ের বাস্তবতা এক নয়। ১৯৮০-এর বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধ ও উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবতায় আবদ্ধ। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব রাজনীতি নতুন বিন্যাসে প্রবেশ করছিল। আর ২০২৬ সালে বিশ্ব মোকাবিলা করছে জলবায়ু সংকট, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ।


একই পরিবারের তিন সদস্য, কিন্তু বাংলাদেশের তিন সময়ের প্রতিচ্ছবি:


জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—তিনজনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একই পরিবারের সদস্য এবং তিনটি ভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বা আছেন। জাতিসংঘের মঞ্চে তাঁদের উপস্থিতিকে তাই শুধু পারিবারিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। বরং তাঁদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার একটি ধারাবাহিক চিত্রও পাওয়া যায়।১৯৮০ সালের বক্তব্যে ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশ্ন। ১৯৯৩ সালে সামনে আসে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও পানি-স্বার্থ। ২০২৬ সালে আলোচনায় যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক সংস্কার।


তাই ২৪ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে এটি একই পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘে উপস্থিতি। এর বড় তাৎপর্য হলো—পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার বর্তমান জাতীয় স্বার্থ, ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান কীভাবে বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করে।

চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে জাতিসংঘের মঞ্চ একই রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে এবং তার চ্যালেঞ্জও বদলেছে। ২০২৬ সালের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে তাই মূল প্রশ্ন হবে—বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থ, উন্নয়ন, শান্তি, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নগুলো কতটা কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়।এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ ভাষণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন সংযোজন। একই পরিবারের তিন সদস্যের উপস্থিতির ধারাবাহিকতা যেমন এতে প্রতিফলিত হবে, তেমনি প্রতিফলিত হবে ১৯৮০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার ও কূটনৈতিক বাস্তবতাও।


-লেখক: কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল , সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সম্পর্কিত খবর

;