২৫ সেমি উচ্চতা বাড়লে ৪% ভূমি তলিয়ে যাবে, ১ কোটি মানুষ ঝুঁকিতে: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ : 24 Sep 2026
২৫ সেমি উচ্চতা বাড়লে ৪% ভূমি তলিয়ে যাবে, ১ কোটি মানুষ ঝুঁকিতে: প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক: জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘High-level Meeting to Address the Existential Threats Posed by Sea-Level Rise’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকালে কনফারেন্স রুম-৪ এ আয়োজিত এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সৃষ্ট বহুমাত্রিক ও অস্তিত্বগত হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বৈঠক আহ্বান করার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানকে এবং ঘোষণাপত্র প্রণয়নে সহ-সমন্বয়কারীদের ধন্যবাদ জানান।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। শত শত নদী আমাদের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে। আমাদের মানুষ পানির কাছাকাছি বসবাস করে, তাই আমাদের সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।


বিশ্বব্যাংকের হিসাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় ১ কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়বে। সীমিত সম্পদ নিয়েও এমন বিপর্যয়কর ভবিষ্যৎ ঠেকাতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে, এর অংশ হিসেবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার এবং উপকূল সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।


জলবায়ু সহনশীলতা শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।


একই সঙ্গে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, সাগর তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভোগের ধরন ও পদ্ধতি নতুন করে ভাবতে হবে।


এই সংকট মোকাবিলায় তিনি চারটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান। প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ আরও দ্রুত, আরও ব্যাপকভাবে এবং আরও ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে এবং ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।


বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে, আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবে এবং কোনো দেশ যেন একা rising tide-এর মুখোমুখি না হয়, তা নিশ্চিত করবে।


জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। একই দিন বিকেলে সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।


সম্পর্কিত খবর

;