মানিক লাল ঘোষ: ইতিহাসের পাতায় কোনো কোনো দিন আসে যা কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্যবদল ও আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছিল তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন তথাকথিত 'পাকিস্তান দিবস'কে হটিয়ে বাঙালির মুক্তি-তৃষ্ণা আর দেশপ্রেমের অগ্নিশপথে জন্ম নিয়েছিল 'প্রতিরোধ দিবস'। আর এই মহাবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে বজ্রকণ্ঠের হিমাদ্রি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের সেই দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে গোটা পূর্ব বাংলা তখন অগ্নিগর্ভ। ২৩ মার্চ সকালে যখন নিয়মতান্ত্রিক পাকিস্তানি শৌর্যবীর্য প্রদর্শনের কথা ছিল, বঙ্গবন্ধু তখন সুষ্পষ্ট ঘোষণা দিলেন—আজ 'প্রতিরোধ দিবস'। নেতার একটি মাত্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাত কোটি বাঙালি সেদিন পরাধীনতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে রাজপথে নেমে আসে।
সেদিন ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা হয়ে উঠেছিল এক 'পতাকার শহর'। আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু হওয়া সেই দিনটি মধ্যগগন গড়াতেই রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব বিপ্লবে। সচিবালয়, উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের গৃহকোণ—সর্বত্র পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে সগৌরবে উড়তে শুরু করল মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের নতুন পতাকা। কালো পতাকার প্রতিবাদী ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের দম্ভ।
সেদিনের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও ঐতিহাসিক দৃশ্যটি রচিত হয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। হাজার হাজার মানুষের মিছিলের সম্মুখে বঙ্গবন্ধু যখন নিজ হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন, তখন সমবেত কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল 'জয় বাংলা, বাংলার জয়'। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সামরিক কায়দায় সালাম আর বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ঘোষণা—"বাংলার দাবির প্রশ্নে কোনো আপস নাই"—প্রমাণ করেছিল, মুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে ছিল এক জাদুকরী শক্তি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তিনি সেদিন দেশবাসীকে শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে সংগ্রামের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, "বহু রক্ত দিয়েছি, প্রয়োজনবোধে আরও রক্ত দেবো, কিন্তু মুক্তির লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবই।" তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নেতৃত্বের ভার তাঁর ওপর এবং লড়াইয়ের গতিপথ তিনিই নির্ধারণ করবেন। তাঁর সেই দূরদর্শী নেতৃত্বই ছিল একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রধান চালিকাশক্তি।
২৩ মার্চের এই আন্দোলন ছিল সর্বজনীন—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, নারী-পুরুষ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরাও সেদিন এক কাতারে শামিল হয়েছিলেন। ঢাকা টেলিভিশনের কর্মীদের বিদ্রোহ কিংবা পল্টন ময়দানে 'জয় বাংলা বাহিনীর' কুচকাওয়াজ—সবই ছিল আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের এক মহাবয়ান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন সেনানিবাসের চার দেয়ালে নিজেদের বন্দি করে পাকিস্তানের পতাকা তোলায় ব্যস্ত, তখন বাংলার প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ীভাবে আসন গেড়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত এই লাল-সবুজ পতাকা।
আজ ৫৫ বছর পর ২৩ মার্চের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সেদিন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও বাঙালি মানসিকভাবে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রকণ্ঠ আর বাঙালির অটল মনোবলই আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে পরাধীনতার অন্ধকার ফুঁড়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে হয়। ২৩ মার্চ তাই বাঙালির সাহসের সেই অবিনাশী দিন, যা আমাদের পৌঁছে দিয়েছে বিজয়ের অভিষ্ট লক্ষ্যে।
-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি।
খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক: একটি পরিবার যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, খাদ্যসংকট, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক আয়হানির মুখোমুখি হয়, তখন সংকটটি কেবল একজন ব্যক্তির থাকে না—তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। তাই সামা ...
সেলিনা আক্তার:শিশুরা ভবিষ্যৎ জাতির রূপকার। একটি দেশ গড়ে তুলতে শিশুদের সুন্দর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্ব প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পর ...
একটা সময় ছিল, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সঙ্গে বই, শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা, খেলাধুলা কিংবা কোনো একটি পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে থাকত। এখন সেই স্বপ্নের জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে প ...
সাইফুল আলম ছদরুল।।রাজনৈতিক মঞ্চের বাগাড়ম্বর, সুশীল সমাজের চটকদার বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা কিংবা শহরের ঝলমলে রেস্তোরাঁর রঙিন আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে এক নির্মম সত্য। যে শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমে নামীদামি ...
সব মন্তব্য
No Comments