রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদী থেকে বেপরোয়া বালু উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা।বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এ ভাঙন আরও তীব্ররূপ ধারণ করেছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের খেজুরবাড়ি, গোয়াইলবাড়ি ও খোদাবখশা, বাইশারী ইউনিয়নের উত্তরকুল, বাংলাবাজার, নাটুয়ার পাড়, শিয়ালকাঠী, উত্তর নাজিরপুর দান্ডয়াট ও ডুমুরিয়া,সৈয়দকাঠী ইউনিয়নের মসজিদবাড়ী, সাতবাড়িয়া,পূর্ব জিরারকাঠী, দাসেরহাট, দিদিহার ও নলশ্রী, সদর ইউনিয়নের জম্বুদ্বীপ, ব্রাহ্মণকাঠী ও কাজলাহার এবং চাখার ইউনিয়নের চাউলাকাঠী, চালিতাবাড়ী,
চিরাপাড়া, কালিরবাজার, হক সাহেবের হাট প্রভৃতি এলাকায় ভয়াবহভাবে ভাঙছে সন্ধ্যা নদী। এসব গ্রাম মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে সিংহভাগ নদী গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে ভিটেমাটি ফসলি জমি সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার।
নদী ভাঙনের কারণে ঝুঁকির মুখে বানারীপাড়ার শিয়ালকাঠী ফেরী ঘাট, উত্তর নাজিরপুর জামে মসজিদ, মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খোদাবখশা দাখিল মাদরাসা, কালির বাজার, জম্বুদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো ভবনসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। এর মধ্যে মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দান্ডয়াট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাটুয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা, উত্তরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,, নলশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাঙ্গালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খোদাবখশা দাখিল মাদরাসাসহ আরও বেশ কয়েকটি স্কুল-মাদরাসা চার থেকে পাঁচ বার স্থানান্তর করতে হয়েছে। এমন পরিবারও রয়েছে যারা নদী ভাঙনের কারণে ৪-৫ বার ঘর স্থানান্তর করেও ফের নদী ভাঙনের মুখে পড়েছে। বানারীপাড়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী উজিরপুর উপজেলার বহু এলাকাও পড়েছে সন্ধ্যা নদীর তীব্র ভাঙনের কবলে। উজিরপুরের শিকারপুর, দাসেরহাট,,লস্করপুর, চতলবাড়ী ও ডাবেরকুলসহ বহু এলাকায় নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছে শত শত মানুষ। গত আওয়ামী লী সরকারের আমলে স্থানীয় জনসাধারণের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সত্ত্বেও বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে ৬টি ও অন্তর্বতীকালীণ সরকারের আমলে ৩টি পয়েন্টের বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। এবারও বরিশাল জেলা প্রশাসন এ ভাঙনকবলিত নদীতে বালুমহাল ইজারা দিয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এ সন্ধ্যা নদীর বানারীপাড়া উপজেলার খেজুরবাড়ী ও মসজিদবাড়ীর পয়েন্টে যথাক্রমে দুই একর ও সাত একর নদীর জায়গা বালুমহাল ঘোষণা করে সম্প্রতি ইজারা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে বরিশালের রূপাতলীর মুসলিম ট্রেডার্স এ বালুমহাল দুটির ইজারা পেয়েছে। উপজেলার মসজিদ বাড়ীর যে পয়েন্টে পাঁচ একর বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়া হয়েছে , সেই পয়েন্টে মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মসজিদ বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ বাড়ী দারুসসুন্নাত আলিম মাদরাসা, মসজিদবাড়ী ইসলামিয়া কলেজ, মসজিদ বাড়ী বালিকা বিদ্যালয়সহ স্থানীয় সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি,রাস্তা-ঘাট, মসজিদ নদীতে বিলীণ হয়ে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি- নদীতে ব্লক দিয়ে ও জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙনের হাত থেকে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তা না করে উল্টো বালুমহাল ইজারা দিয়েছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের মাঝে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে । এর আগে গত বছর এ নদীতে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে বানারীপাড়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ মিছিল ও মানববন্ধন করে সর্বস্তরের মানুষ। নদী ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময় বালুমহাল ইজারা বন্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশনও দাখিল করা হয়। উপজেলার খেজুরবাড়ি ও মসজিদবাড়ীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় সচেতনমহল। তাদের মতে, স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে নদী ভাঙনকবলিত এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে মানুষের দুর্ভোগ ও বাস্তুহারা হওয়ার ঝুঁকি চরমভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নদী ভাঙন কবলিত এলাকার বিশিষ্টজন, বাংলা একাডেমি পুরস্কাপ্রাপ্ত অনুবাদক ও সাবেক রাজস্ব বোর্ডের সদস্য আলী আহমদ বলেন, ভাঙনকবলিত নদীতে স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে বালুমহাল ঘোষণা করে। এ বিষয়ে আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ ভাঙনকবলিত নদীতে বালু তোলার কারণে আমার এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মসজিদ বাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৪ বার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবার সবার সহযোগিতায় নতুন করে স্থানান্তর করে তৈরি করেছি। অব্যাহত ভাঙনের ফলে এখন আবার এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নদীর কিণারে এসেছে। আমরা নদীভাঙন রোধে যেখানে সরকারের সহযোগিতা চাচ্ছি, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন বালুখেকোদের বালু তোলার সুব্যবস্থা করে দিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষদেরকে নদীগর্ভে বিলীন করতে চাচ্ছে। মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ নজরুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, সন্ধ্যা নদী ষাট দশক ধরে ভাঙছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চার বার স্থানান্তর করতে হয়েছে। মসজিদ বাড়ী গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ হলেও নদী ভাঙনের কারনে স্থানান্তর করে এটি পাশের গ্রাম সাতবাড়িয়ায় নেওয়া হয়েছে। এখন সাতবাড়িয়া গ্রামও ভাঙছে। সেখানেও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। উপজেলার খোদাবখশা দাখিল মাদরাসার সহকারি শিক্ষক মোঃ খায়রুল ইসলাম রাসেল বলেন নদী ভাঙনের ফলে বেশ কয়েকবার মাদরাসাটি স্থানান্তর করতে হয়েছে। এখনও ভাঙন হুমকিতে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বসত বাড়িও নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে বলেও জানান তিনি। উপজেলার উত্তর নাজিরপুর ধানের হাট জামে মসজিদের সাবেক সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন ফকির বলেন,নদী ভাঙনের ফলে বার বার মসজিদটি স্থানান্তর করতে হয়েছে ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় মসজিদটি এখন আবার নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রসঙ্গত, মৎস্য সম্পদে সন্ধ্যা নদী ভরপুর। এ নদীর দু’পাড়ের অসংখ্য মানুষ এ নদীতে ইঁলিশসহ নানা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ নদীতে বালু তোলার ফলে মৎস্য প্রজননের অভয়ারণ্য বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে জেলেদের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০- উল্লেখ রয়েছে- বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে যদি কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হয় এমন নদী থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণি, ফসলি জমি বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হয় বা হবার আশঙ্কা থাকে এমন নদী থেকেও বালু উত্তোলন করা যাবে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়- নদী ভাঙনের কারণ হচ্ছে নদী দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ করতে হবে। জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের জন্য বালুমহাল ইজারা দিয়ে থাকে। সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসনকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে বালুমহাল ঘোষণা করতে হবে। তবে অনেক সময় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইজারাদাররা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নদীর তীরসংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে। ফলে নদীর তীর সংরক্ষণ করা যায় না, আবার ভাঙন শুরু হয়। নদীশাসন ও নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ না করা গেলে প্রকল্পগুলোর সুফল অনেকাংশে কমে যাবে। তাই যেকোনোভাবেই স্থানীয় প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বায়েজিদুর রহমান বলেন, বরিশাল জেলার মধ্যে শুধু বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীতে দুটি পয়েন্টে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজে বালুর চাহিদার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে বৈধ বালু মহাল ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও বরিশাল জেলা বলুমহাল কমিটির সভাপতি মো,. খায়রুল আলম সুমনের সঙ্গে তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিলে তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে নদীর ভাঙনকবলিত ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর কাছে নদী ভাঙনরোধকল্পে স্থায়ী ও টেকসই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
বরিশাল অফিস: ভোলায় ২০ কেজি গাঁজাসহ একজন মাদক কারবারি আটক করেছে কোস্ট গার্ড।শুক্রবার ১৫ মে ২০২৬ বিকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।তিনি বলেন, ভোলার ...
নারায়নগঞ্জ প্রতিনিধি: সোনারগাঁয়ে ঐতিহ্যবাহী পঙ্খিরাজ নদী পুনঃখনন ও সংরক্ষণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’। শুক্রবার (১৫ মে) সকালে উপজেলার পানাম ...
রাহাদ সুমন ,বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালের বানারীপাড়ায় ডিবি ও থানা পুলিশের মাদকবিরোধী পৃথক বিশেষ অভিযানে কাওছার ও মেহেদী হাসান হীরা নামের দুই মাদক কারবারিকে ৫২ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব ...
রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি: বরিশালের গৌরনদীতে নিরীহ ভ্যান চালক মঞ্জু বেপারী (৫০) খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের দাবীতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে গ্রামবাসী। শুক্রবার (১৫ মে) সকাল ...
সব মন্তব্য
No Comments