জনগণের নাভিশ্বাস ওঠা জীবনে আসছে বাজেটে যা চাই!

প্রকাশ : 10 Jun 2026
জনগণের নাভিশ্বাস ওঠা জীবনে আসছে বাজেটে যা চাই!


অন্তবর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়েছে। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের সামনে আবারো উপস্থিত জাতীয় বাজেট ঘোষণার সেই অমোঘ সন্ধিক্ষণ!‘বাজেট’ শবদটি শুনলেই আমাদের চোখে-মুখে-অন্তরে-বাহিরে ভয় আর অস্বস্তি এসে হাজির হয়। এই বুঝি বাড়লো নিত্যব্যবহার্য্য জিনিসপত্রের দাম আর কমল বুঝি বিলাসী পণ্যের দাম। আর এখনতো চলছে আরো মজার টেকনিক—জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগেই বাড়ানো হচ্ছে অনেক পণ্যের দাম। আর বাকিটা বাজেট ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথেই বেড়ে যাবে—এমনকি বাজেট পাশ হওয়ার আগেই।

তাই নাভিশ্বাস ওঠা জীবনে আসছে বাজেটে যা চাই —

প্রথমত: নেহায়েৎ জরুরি কোনো কারণ ছাড়া কোনো কিছুরই যেন দাম না বাড়ে।

দ্বিতীয়ত: শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮ ভাগ বরাদ্দ চাই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে কেবলমাত্র অবকাঠামো তৈরিতে বরাদ্দ নয় বরং শিক্ষা কারিকুলাম উন্নয়ন, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক ছাপানো, শিক্ষকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন এবং তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে শিক্ষা-গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে। ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে’র এই সময়ে তরুণ ও যুবদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে বিদ্যমান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলে  তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানে সঠিক দিক নির্দেশনা বাজেটে দেখতে চাই। 

তৃতীয়ত: সাধারণ নাগরিকের দোরগোড়ায় মোটামুটি মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পৌঁছাবে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হোক—এমনটা চাই। এক্ষেত্রে যারা কারণে-অকারণে দেশেরে বাহিরে চিকিৎসা নিতে যায় প্রয়োজনে তাদের উপর ‘চিকিৎসা-কর’ বসানোর কথা সরকার ভাবতে পারে। আর সরকার পরিচালনার সাথে যুক্ত রাজনৈতিক এবং সিভিল প্রশাসনে দায়িত্বরতদের (খুব বিশেষায়িত কোনো কারণ ছাড়া) দেশে চিকিৎসা গ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাধ্যতামূলক করলেই একমাত্র স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্নীতি কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভবপর হবে বলে মনে করি।

চতুর্থত: বিএনপি সরকারের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের জন্য সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি—যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। সরকারের বার্ষিক বাজেটে এই বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চাই। আরো চাই—ফসল তোলার পর কৃষক যেন ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় সেজন্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়, আলুর সিজনে কোল্ড স্টোরেজে ন্যূনতম খরচে কৃষকের অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ, উৎপাদিত শাক-সবজি-তরী-তরকারি-মাছ-মাংস-দুধ-ডিম সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং সংরক্ষিত দ্রব্যাদি কম খরচে পরিবহনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহরাঞ্চলে পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে  কুলিং ভ্যানের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট রাখা আছে।

পঞ্চমত: দেশের শ্রমজীবী ও গৃহহীন মানুষ যেন সহজে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে পারে সেজন্য বাজেটে পর্যায়ক্রমিক বরাদ্দ দেখতে চাই।

ষষ্ঠত: কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ চাই—যেমন আলুর সিজনে উৎপাদিত বাড়তি আলু হতে স্টার্চ তৈরির শিল্প গড়ে তুলতে এবং কৃষকদের স্টার্চ উপযোগী উন্নত জাতের আলু উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেয়া হোক।

সপ্তমত: সামাজিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক অস্থিরতা, সাইবার অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মাধ্যমে জনজীবনে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আর্থ-সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাজেটে কোন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে সেবিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশন চাই। 

সর্বোপরি এমন একটি জাতীয় বাজেট চাই—যেখানে কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের সুযোগ না থাকে আর সেই সঙ্গে যেন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বাজেট বাস্তবায়নে যথাযথ সচেতনতা তৈরি করে দক্ষ কর্মকর্তাদের ‘অন্তর্ভুক্তি’ নিশ্চিত করা হয়।


-লেখক: সামসুল আলম সজ্জন, সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

সম্পর্কিত খবর

;