মানিক লাল ঘোষ: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকরা ছিলেন জাতির বিবেক ও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁদের কলম ছিল শাণিত অস্ত্র, যা একদিকে শত্রুর অপপ্রচার রুখে দিয়েছে, অন্যদিকে জনগণের মনে জাগিয়েছে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই সাহসী ভূমিকার জন্য জাতির বিবেক বলে খ্যাত সাংবাদিকদের দিতে হয়েছে চরম মূল্য।
১৪ ডিসেম্বর, বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক কালো অধ্যায়। এক বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর, বিশেষ করে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী, প্রকৌশলী ও লেখক-বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। সদ্য স্বাধীন হতে যাওয়া দেশকে মেধা ও মননশূন্য করে দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।
পরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করা শহীদদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন সাংবাদিক। সত্যের পক্ষে থেকে বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানোই ছিল তাঁদের একমাত্র অপরাধ।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার এই সাহসী শহীদ সাংবাদিকরা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁদের গুরুত্বও ছিল বহুবিধ:
যুদ্ধের সময় তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রণাঙ্গনের খবর সংগ্রহ করে মুক্তির বার্তা প্রচারের মাধ্যমে দেশবাসীকে সাহস জুগিয়েছেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন গণহত্যার বিভৎস্য চিত্র।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বাধিকার এবং চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে মূল ভূমিকা পালন করে সাংবাদিকদের ক্ষুরধার লেখনী।
দখলদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে প্রধান সেনানীর ভূমিকায় ছিলেন তাঁরা। সাংবাদিকদের লেখনী বাঙালি যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখতে সাহায্য করেছে। যুদ্ধ জয়ের স্বপ্নকে করেছে বেগবান।
১৪ই ডিসেম্বরের হত্যাযজ্ঞে যেসব প্রথিতযশা সাংবাদিক শহীদ হন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
সিরাজুদ্দীন হোসেন: দৈনিক ইত্তেফাক-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক। তাঁর সাহসী ও প্রগতিশীল লেখালেখির জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাতে আল-বদর বাহিনী তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
শহীদুল্লা কায়সার: প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও দৈনিক সংবাদ-এর যুগ্ম সম্পাদক। তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিক ও কমিউনিস্ট কর্মীও ছিলেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত উপন্যাস হলো 'সংশপ্তক' ও 'সারেং বৌ'। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিকেলে আল-বদর বাহিনী তাঁকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়।
সেলিনা পারভীন: সাপ্তাহিক 'শিলালিপি' পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক। তাঁর পত্রিকায় স্বাধীনতার পক্ষের সাহসী বার্তা প্রকাশিত হতো। নারী সাংবাদিকতার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদর কর্মীরা তাঁকে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
নিজামুদ্দীন আহমদ: দৈনিক পূর্বদেশ-এর বার্তা সম্পাদক এবং বিবিসি (PPI) সংবাদদাতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নির্ভীক সাংবাদিকতা পাক বাহিনীর রোষানলে পড়ে। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী তাঁকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
এ এন এম গোলাম মোস্তফা: দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাংবাদিক। এছাড়াও তিনি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকাতেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আল-বদর বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।
শহীদ সাবের: দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক ও সাহিত্যিক। ২৫ মার্চ কালো রাতে দৈনিক সংবাদ অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় পাক বাহিনীর অগ্নিসংযোগে নির্মমভাবে নিহত হন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ।
খোন্দকার আবু তালেব: দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিখোঁজ হন।
এস এ মান্নান (লাডু ভাই): সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিখোঁজ হন।
শিবসাধন চক্রবর্তী: পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন।
সৈয়দ নজমুল হক: সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিখোঁজ হন।
চিশতি হেলালুর রহমান: দৈনিক আজাদ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলেন।
আবুল বাসার: সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিখোঁজ হন।
নিয়াজ মো. মোহাম্মদ খান: পূর্ব দেশ-এর সাংবাদিক।
আতাউর রহমান খান: সংবাদ-এ কর্মরত ছিলেন।
মুহাম্মদ আখতার: দৈনিক ইত্তেফাক-এ কর্মরত ছিলেন। তিনি তাঁর বাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও তাঁদের আগরতলা যাওয়ার জন্য পথ চিনিয়ে দিতেন। ১৪ ডিসেম্বর পুরানা পল্টন বাসা থেকে তাঁকে আল-বদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায়।
এই শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকেরা শুধু ব্যক্তি নন, তাঁরা আমাদের মুক্তচিন্তা, নির্ভীকতা এবং নৈতিকতার প্রতীক। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সত্য প্রকাশ একটি জাতির টিকে থাকার জন্য কতটা জরুরি।
আজকের দিনে যখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের জীবন আমাদের সামনে প্রেরণা ও আদর্শের বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে তাঁদের মতো করেই সাহসিকতার সঙ্গে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকেরা অমর। জাতি আজীবন তাঁদের কাছে ঋণী। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি।
আফসানা আরেফিন:আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে ...
মুক্তার হোসেন নাহিদ:মায়ামির রাতের আকাশে নীল-সাদার সমারোহ। হার্ড রক স্টেডিয়ামে "আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা" প্রতিধ্বনি। দুনিয়াজুড়ে পর্দার সামনে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠেও একই আওয়াজ। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ম স্থ ...
স্টাফ রিপোর্টার: মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দিনব্যাপী একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।শুক্রবার ...
বিল্লাল বিন কাশেম:বিশ্বকাপ ফুটবল নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আসর। চার বছর পরপর এই প্রতিযোগিতা ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও আবেগের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও এর ব্যত ...
সব মন্তব্য
No Comments