স্টাফ রিপোর্টার: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আরব গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু এর পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র, যার শিরোনাম ছিল ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, নভেম্বর ১৩’। অস্ট্রীয়-মার্কিন পদার্থবিদ হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার, প্যাট্রিশিয়া মোরা ও লরেন্স অ্যামিয়ট যৌথভাবে গবেষণাটি করেছিলেন এবং খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের জনসংখ্যা সম্পর্কে পাওয়া ২৪টি ঐতিহাসিক অনুমান বিশ্লেষণ করেছিলেন।
গবেষকেরা সাধারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাবের বদলে ‘হাইপারবলিক গ্রোথ’ নামের একটি গাণিতিক মডেল ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে শুধু জনসংখ্যার সংখ্যাই বাড়ে না, সময়ের সঙ্গে বৃদ্ধির গতিও ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তাঁদের যুক্তি ছিল, মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা, সামাজিক সম্পর্ক ও জোট গঠনের প্রবণতা নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করে, ফলে মানুষ পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে পারে এবং বেঁচে থাকা ও প্রজননের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এই মডেল ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা ২০২৬.৮৭ সালকে একটি গাণিতিক সিঙ্গুলারিটি বা অসীমতার বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা ক্যালেন্ডারের হিসাবে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। এ কারণেই শিরোনামে ১৩ নভেম্বর শুক্রবারের কথা এসেছিল।
গবেষণার শিরোনামে ‘ডুমসডে’ শব্দটি থাকলেও গবেষকেরা কোনো গ্রহাণুর আঘাত, সূর্যের বিস্ফোরণ, ভূমিকম্প কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কথা বলেননি, এমনকি মানবজাতি কোন তারিখে বিলুপ্ত হবে, সে বিষয়েও কোনো পূর্বাভাস দেননি। এখানে অসীম বলতে বাস্তবে মানুষের সংখ্যা অসীম হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়নি, বরং নির্দিষ্ট একটি গাণিতিক সমীকরণকে ভবিষ্যতের দিকে সম্প্রসারণ করলে যে তাত্ত্বিক ফল পাওয়া যায়, সেটিই নির্দেশ করা হয়েছিল। বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অসীম হওয়া সম্ভব নয়, কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশ, খাদ্য, সম্পদ, জন্মহার ও মৃত্যুহারের মতো নানা বিষয় জড়িত, যা বৃদ্ধির গতিপথকেও প্রভাবিত করে।
১৯৬০ সালের গবেষণার পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে মিসরের সংবাদপত্র ‘ওয়াতানি’-তে ১৯৬৪ সালের ২৯ নভেম্বর মিশেল তাকলারের লেখা একটি পুরোনো নিবন্ধ, যার শিরোনামেও ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর সমাপ্তির প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বলে প্রচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি মিসরের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পুরোনো সংবাদপত্রটির কাটিংয়ের ছবি প্রকাশিত হলে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। তবে ১৯৬০ সালের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ১৯৬৪ সালের সংবাদপত্রের নিবন্ধ এক বিষয় নয়, ১৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সঙ্গে সম্পর্কিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির গাণিতিক হিসাবটি প্রথম গবেষণাপত্রেই তুলে ধরেছিলেন হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার ও তাঁর সহকর্মীরা। মিশেল তাকলারের নিবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ এসেছে, আবার কোথাও সৌর কার্যকলাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে, তবে মূল নিবন্ধের পূর্ণাঙ্গ পাঠ যাচাই ছাড়া এসব দাবিকে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
পুরোনো নিবন্ধকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর অস্বাভাবিক সৌর কার্যকলাপের আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে, যেখানে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের কার্যকলাপ একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, সূর্যের নির্দিষ্ট চক্র রয়েছে, যার কারণে কখনো সৌরশিখা বা সোলার ফ্লেয়ার এবং করোনাল মাস ইজেকশন বা সূর্য থেকে বিপুল পরিমাণ পদার্থ নির্গত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, এতে স্যাটেলাইট, যোগাযোগব্যবস্থা, নেভিগেশন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সৌরঝড়ের কারণে প্রযুক্তিগত বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা আর নির্দিষ্ট কোনো দিনে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দাবি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ১৯৬০ সালের জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বরের সৌর কার্যকলাপ বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কথা বলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এমাদ মুজাহেদ। তিনি জানান, চলতি বছর সৌর কার্যকলাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, তবে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, কোনো আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি নয়। তাঁর মতে, সৌর কার্যকলাপ নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক চক্র অনুসরণ করে, সৌরঝড় মহাবিশ্বের শুরু থেকেই বিদ্যমান, তবে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিজ্ঞানীরা এখন আগের তুলনায় এসব ঘটনা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস দিতে পারছেন। মুজাহেদ আরও বলেন, ১৩ নভেম্বর এমন কোনো পরিচিত বা প্রত্যাশিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটার কথা নেই, যা পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কের কারণ হতে পারে, আর গাণিতিক সমীকরণ কিংবা মহাকাশবিষয়ক কোনো মডেলের মাধ্যমে পৃথিবীর ধ্বংসের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণের ধারণাও তিনি নাকচ করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সর্বশেষ তথ্য এসেছে খোদ ‘সায়েন্স’ থেকেই। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর একই সাময়িকীতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা বারবারার অর্থনীতিবিদ হাভিয়ের বির্চেনালের একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ‘ডেমোগ্রাফিক ডুমসডে মিসেস দ্য মার্ক’। সেখানে বলা হয়, ফন ফোরস্টারের সমীকরণের ব্যর্থতা মূলত ঐতিহাসিকভাবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতের দিকে অতিরিক্ত সম্প্রসারণের বিপদ সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা। অর্থাৎ মডেলটি কয়েক দশক ধরে জনসংখ্যার প্রবণতাকে বেশ ভালোভাবে ধরতে পারলেও শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেছে, কারণ অতীতের ধারা চিরকাল একইভাবে চলবে, এই অনুমানটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
১৯৬০ সালের গবেষণার অন্যতম সীমাবদ্ধতা ছিল অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা ভবিষ্যতেও একইভাবে চলবে বলে ধরে নেওয়া, কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে বিশ্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনমিতিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা কমতে শুরু করে, বিভিন্ন দেশে জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি আগের মতো থাকেনি। গবেষণাটি প্রকাশের সময় বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩০০ কোটি, বর্তমানে তা ৮০০ কোটির বেশি হলেও ১৯৬০ সালের মডেলে অনুমান করা অসীমতার কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪’ প্রতিবেদনেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮২০ কোটি, ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, এরপর ধীরে ধীরে কমে ২১০০ সালে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটিতে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই বিশ্বের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, এর অন্যতম কারণ হলো বিশ্বের বেশ কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে জন্মহার আগের প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত কমে যাওয়া।
ফলে বর্তমানে জনসংখ্যা নিয়ে আলোচনায় শুধু অতিরিক্ত জনসংখ্যার বিষয়টিই নয়, বরং জন্মহার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ১৯৬০ সালের গবেষণাটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ, সেটিকে পৃথিবীর শেষ হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে প্রচার করা মূল গবেষণার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা। তাই পুরোনো একটি গবেষণার শিরোনাম দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
ডেস্ক রিপোর্ট: গ্লোবাল টেক জায়ান্ট ও বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান হ্যান্ডসেট ব্র্যান্ড শাওমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে এর নতুন স্মার্টফোন, রেডমি ১৭ ফাইভজি নিয়ে এসেছে। দ্রুতগতির কানেক্টিভিটি, নির্ভরযোগ্য পা ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার জিতেছেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসেরোথ এবং জার্মানির দুই বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান ও জর্জ ন্যাগে ...
ডেস্ক রিপোর্ট: তরুণ প্রজন্মের পছন্দের স্মার্টফোন ব্র্যান্ড রিয়েলমি বাংলাদেশে তাদের নতুন সি-সিরিজ স্মার্টফোন উন্মোচন করতে চলেছে। অল-রাউন্ড ইউজেবিলিটি চান এমন ব্যবহারকারীদের জন্য, দীর্ঘমেয়াদী পাওয়ার, উ ...
ডেস্ক রিপোর্ট: স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; পড়াশোনা, কাজ, বিনোদন, গেমিং থেকে শুরু করে প্রতিদিনের নানা প্রয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। ফলে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাটারি ব্ ...
সব মন্তব্য
No Comments