জ্বালানি সংকটে বাড়তি ডিজেল দিতে বাংলাদেশের অনুরোধ বিবেচনা করবে ভারত

প্রকাশ : 14 Aug 2026
জ্বালানি সংকটে বাড়তি ডিজেল দিতে বাংলাদেশের অনুরোধ বিবেচনা করবে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, তা নিজেদের চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা ও দেশে জ্বালানির প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করবে নয়াদিল্লি। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল।


বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জয়সোয়াল বলেন, দুই দেশের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের একটি চলমান ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেটি অব্যাহত আছে। তবে বাংলাদেশ অতিরিক্ত যে সরবরাহ চেয়েছে, সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা এবং দেশের অভ্যন্তরে ডিজেলের প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হবে।


ভারতের এই বক্তব্যে আপাতত অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের নিশ্চয়তা না মিললেও বাংলাদেশের অনুরোধটি দিল্লি যে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করছে, সেটি স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ডিজেল চেয়েছিল। তখনও ভারত জানিয়েছিল, নিজেদের চাহিদা ও জ্বালানির প্রাপ্যতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ডিজেল সরবরাহের বিদ্যমান ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন’। ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে ডিজেল আসে। প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের ৫ কিলোমিটার অংশ ভারতে এবং ১২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার বাংলাদেশে। পাইপলাইনটির বার্ষিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১০ লাখ টন হলেও দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করা হয়।


চলতি বছরও ভারত থেকে কয়েক দফায় ডিজেল এসেছে বাংলাদেশে। মার্চে ৫ হাজার টনের চালানসহ একাধিক চালান পাইপলাইনে এসেছে। এপ্রিলেও ভারত থেকে ৮ হাজার টন ডিজেল পার্বতীপুরে পৌঁছায়। ওই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় ভারত থেকে মোট ২৫ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল।


বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয় সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগটি মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর অংশ। চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশ ভারতকে আগামী কয়েক মাসে মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন ডিজেল দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করেছিল। সে সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানিয়েছিলেন, ঢাকার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।


বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ডিজেলের গুরুত্বও অনেক বেশি। দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৬৮ লাখ টন পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ডিজেল ছিল প্রায় ৪৩ দশমিক ৫ লাখ টন। দেশের পেট্রোলিয়াম চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দ্রুত চাপ তৈরি হয়।


এর আগে জুলাইয়ে অবশ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং ডিজেল সংকট নেই। সে সময় মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন ডিজেল মজুত ছিল, যা প্রায় ৩১ দিনের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট বলে জানানো হয়েছিল। আগস্ট মাসের জন্যও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।


তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদক্ষেপ আরও কঠোর করেছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।


বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। দেশে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। শিল্পকারখানা, পরিবহন, কৃষি ও বিভিন্ন জরুরি সেবাতেও ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। ফলে আমদানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বাজারে দ্রুত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।


এদিকে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ডিজেল চাওয়ার বিষয়টি শুধু জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি ঢাকা-দিল্লির সামগ্রিক সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতির সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক ও আরও কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।


এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সফর নিয়ে কোনো অগ্রগতি হলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে বলে জানান তিনি।


ভারতের আমন্ত্রণটি নতুন নয়। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।


এর বাইরে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও রয়েছে বলে শুক্রবার দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও জানিয়েছে। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগস্টের ২২ বা ২৩ তারিখে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সফরের নির্দিষ্ট তারিখ ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।


সফরটি হলে জ্বালানি সহযোগিতা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হতে পারে। এর পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।


তবে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান যে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভরশীল থাকবে, শুক্রবারের বক্তব্যে সেটিও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত কত ডিজেল, কখন এবং কোন ব্যবস্থায় দেওয়া হবে—তা এখনই নিশ্চিত নয়। দিল্লির পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ভারতের নিজস্ব বাজারে জ্বালানির চাহিদা, নুমালিগড়সহ দেশটির পরিশোধনাগারগুলোর সক্ষমতা এবং সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত পরিস্থিতির ওপর।


বাংলাদেশের জন্য তাই ভারতের বিদ্যমান সরবরাহ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ডিজেলের বিকল্প উৎসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি সংকটের সময় সরকার ভারত ছাড়াও চীনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে বড় পরিমাণ ডিজেল আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য একদিকে দেশের জ্বালানি মজুত নিরাপদ রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ কোনো সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।


সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বাড়তি ডিজেল চাওয়ার বিষয়ে ভারতের শুক্রবারের বক্তব্যে ইতিবাচক সম্ভাবনা থাকলেও কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি নেই। তবে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ডিজেল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু থাকা এবং অতিরিক্ত সরবরাহের অনুরোধ পর্যালোচনার বিষয়টি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ায় জ্বালানি সহযোগিতাসহ ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে নতুন সমঝোতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর

;