সংসদে বিরোধী দল

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট

প্রকাশ : 24 Jun 2026
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট

স্টাফ রিপোর্টার: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে সাধারণ আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উঠে এসেছে। সরকারি দলের সদস্যরা বাজেটকে গণমুখী ও ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট’ বলে অভিহিত করলেও বিরোধী দলীয় সদস্যরা একে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট’ বলে মন্তব্য করেছেন।


গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় প্রথমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার ওয়ান-ইলেভেনের সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের ঘটনার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, তারেক রহমান সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জানিয়েছেন, এখনো এক্স-রে করলে দেখা যাবে তার মেরুদণ্ডের একটি হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে আছে। তিনি উল্লেখ করেন, তারেক রহমান প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তবে এ ঘটনার প্রকৃত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


বাজেটকে গণমুখী আখ্যা দিয়ে শাম্মী আক্তার বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সুরক্ষা ও কার্বন নিরপেক্ষ শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এবারের বাজেটে সময়োপযোগী উদ্যোগ রয়েছে। সোলার ইনভার্টার, সোলার মডিউল, লিথিয়াম ব্যাটারি, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে তিনি মনে করেন।


মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বাজেটের পরিসংখ্যান নয়, বাজারে পণ্যের দাম দেখে। তাই উৎপাদন ব্যয় কমানোই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত পথ। কৃষিতে সার, বীজ, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্যখাতের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানোর উদ্যোগ উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে বলে তিনি জানান। তিনি বাজেট বাস্তবায়নে সব দলের সহযোগিতার আহ্বান জানান।


অন্যদিকে বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে দেশের বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। সে সময় প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। বর্তমানে স্বর্ণের দাম প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৪০০ গুণ বেড়েছে। অথচ বাজেট বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ গুণ। তাই মুদ্রাস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান বাজেটকে সবচেয়ে বড় বাজেট বলা যায় না। এটিকে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট বলাই যুক্তিযুক্ত।


বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকার অভিযোগও তোলেন তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে অর্থবিল সংসদে উপস্থাপনের আগে স্থায়ী কমিটিতে পর্যালোচনা হলেও বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাজেট তৈরি হয় এবং সংসদ সদস্যরা কেবল অনুমোদন করেন।


ব্যাংক খাত থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনার সমালোচনা করে নাজিবুর রহমান বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নাজুক হওয়ায় অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, দেশে মাত্র ২৪ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ কর দিলেও ভ্যাটের বোঝা সবাইকে বহন করতে হয়। নতুন করে বিভিন্ন পণ্য ও সেবাকে ভ্যাটের আওতায় আনা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন।


আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, জনগণ কারো খাঁচার মাছ নয়। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে দেশছাড়া করেছে। বিএনপি-জামায়াতকেও সুশাসন দিতে হবে। চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে দেশ চালালে পরিণতি কী হবে, তা ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাদের বিদেশে যাওয়ার জায়গা থাকতে পারে, কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সেই সুযোগ নেই। তাই জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির আহ্বান জানান।


সম্পর্কিত খবর

;