আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাইবে দুদক

প্রকাশ : 17 Sep 2026
আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাইবে দুদক

স্টাফ রিপোর্টার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও দেশে-বিদেশে লেনদেনের নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে তার স্ত্রীর তথ্যও চাওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুদক থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।


দুদকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি ক্রয়, অর্থপাচারসহ দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য ও নথি চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।


দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠির সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সরবরাহের জন্য বিএফআইইউকে অনুরোধ করা হয়েছে। চাওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে দেশের সব ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের নামে থাকা সব ধরনের হিসাবের (চালু, সুপ্ত বা বন্ধ) বিস্তারিত বিবরণ, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস এবং ঋণ সংক্রান্ত নথিপত্র। এছাড়া পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচার এবং শেল কোম্পানি গঠন সংক্রান্ত দলিল ও রেকর্ডপত্র এবং বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ওই পাঁচ দেশে তাদের কোনো ব্যাংক হিসাব বা বিনিয়োগের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, সে সংক্রান্ত সংগৃহীত তথ্য।


চিঠিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দায়িত্ব পালনকালীন অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং বিদেশে শেল কোম্পানি গঠনে একাধিক অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।


এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অভিযুক্ত বাকি তিনজন হলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন ও উপ-সচিব মো. মাসুম আহমেদ।


অনুসন্ধানে দুদকের উপ-পরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। ইতোমধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুদকে এসে পৌঁছেছে।


গত ১৩ সেপ্টেম্বর আরও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানের পরিধি বাড়ায় দুদক। সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।


নতুন অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় ডিসি পদায়ন বাণিজ্য, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে টেন্ডার কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পাচারকৃত অর্থের মধ্যে দুবাইতে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয়, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং গ্রীন গ্রুপে মূলধন যোগান, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় পর্তুগালে জমি ক্রয়ের বিষয়টিও অভিযোগে উঠে এসেছে।


অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ৩য় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।


এদিকে তদন্ত চলাকালে আসিফ মাহমুদ দেশ ছাড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছে দুদক। এ কারণে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। দুদকের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান চলাকালে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে, তিনি দেশ ত্যাগ করলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ এবং গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারে আইনি নোটিশও দেন তিনি। যদিও দুদক সচিব ৯ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, আইন-বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান চলবে। দুদক বলছে, উল্লিখিত সব বিষয়ই এখনো অভিযোগ পর্যায়ে রয়েছে এবং যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধান চলছে।


সম্পর্কিত খবর

;