‘আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে, এটা সংসদীয় রীতির মধ্যে পড়ে না’: সংসদে রুমিন ফারহানার

প্রকাশ : 10 Sep 2026
‘আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে, এটা সংসদীয় রীতির মধ্যে পড়ে না’: সংসদে রুমিন ফারহানার

স্টাফ রিপোর্টার: ‘গতকালকে আমি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তাতে এই সংসদে কোনও ডিসেন্ট ভয়েস রেকর্ড করা যায় বলে আমার মনে হয়নি’—উল্লেখ করে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।


বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬-এর ওপর জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।


বক্তব্যের শুরুতেই আগের দিনের সংসদীয় পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিলের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে গতকালকে আমি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তাতে এই সংসদে কোনও ডিসেন্ট ভয়েস রেকর্ড করা যায় বলে আমার মনে হয়নি। এবং আমি কথা বলার পরে সংসদে যে ধরনের আচরণ আমি লক্ষ্য করেছি, সেটা কোনও দেশের সংসদে হয় না।’


তিনি বলেন, ‘আমার কথার যদি কোনও কাউন্টার বলার ব্যাপার থাকতো, সেটা দাঁড়িয়ে বলা যেত। আমি বক্তব্য শেষ করার পরে বক্তব্য দেওয়া যেত। শুধু তাই নয়, মাননীয় স্পিকার, এই মহান সংসদে আমাকেই আশপাশের সংসদ সদস্যরা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছেন। এটা কোনও সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না।’


সংসদে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘একটা সংসদে সরকারি দল থাকবে, বিরোধী দল থাকবে, সংসদে স্বতন্ত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও থাকবেন। একেক জনের একেক রকম মত থাকতে পারে। সেটা প্রকাশ করার স্বাধীনতা প্রত্যেকের থাকা উচিত।’


নিজের অতীত সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই সংসদে যখন আমি একা দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের ২০১৮ সংসদে বিএনপির পক্ষে কথা বলেছিলাম, তখনও আমাকে এ জঘন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এরপরে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ভোটের মাধ্যমে সংসদ আনলাম। সেখানে যদি ন্যূনতম কোনও পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে এই সংসদে বিরোধী দল সেজে শুধু না ভোট দেওয়ার জন্য থাকার কোনও দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।’


এর আগে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর ওপর আলোচনাকালে রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে ঘিরে সরকারি দল বিএনপির সদস্যদের সঙ্গে তুমুল হট্টগোল হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিলের দ্রুত পাস এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নে রুমিনের সমালোচনার পর কয়েকজন সংসদ সদস্য দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। সেই ঘটনার জেরেই বৃহস্পতিবার তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।


একই সঙ্গে র্যাব বিলুপ্ত করে গঠিতব্য স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) যেন শুধু নাম ও পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে র্যাবের নতুন রূপ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।


রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে যে বিলটি এসেছে, সেটির ধারা-উপধারা অনুযায়ী আমি একটা রিসার্চ পেপার রেডি করেছি। র্যাবকে বিলুপ্ত করার ব্যাপারে শুধু বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোই যে কেবল ঐকমত্যে এসেছিল, তাই নয়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত এই সংস্থাটি বাতিলের জন্য প্রশ্ন তুলেছিল।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিনীত বক্তব্য হচ্ছে, এর পরিবর্তে নতুন যে সংস্থা আমরা করতে যাচ্ছি, সেটি যেন কেবল পোশাক পরিবর্তনের মতো না হয়। বাংলাদেশে বিগত দিনে আমরা যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা দেখেছি, নানাভাবে মানুষকে হয়রানি হতে দেখেছি, মানুষকে নির্যাতিত হতে দেখেছি, ভীত হতে দেখেছি—ভবিষ্যতে আমরা এ রকম আর কোনও সংস্থার আচরণ চাই না।’


দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছে। আমি আশা করবো অন্তত এই সংসদে যারা উপস্থিত আছেন, যে দলগুলো উপস্থিত আছে, তারা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।’


রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ বাহিনী হোক, র্যাব হোক কিংবা অন্য কোনও রাষ্ট্রীয় বাহিনী হোক, তারা যাতে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে দলীয়করণমুক্ত হয়ে, প্রভাবমুক্ত হয়ে যার যার মতো কাজ পরিচালনা করতে পারে। এ ব্যাপারটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে, সরকার দেখবে—আমি আশা করবো।’


এ সময় রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পর স্পিকারও সংসদে বাকস্বাধীনতা ও পরস্পরের বক্তব্যে বাধা না দেওয়ার বিষয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সরকারি দল বা বিরোধী দলের প্রত্যেক সদস্যের বক্তব্যের সময় অন্য পক্ষ থেকে কোনও ধরনের বাধা দেওয়া হবে না—এটি তিনি আশা করেন।


উল্লেখ্য, এর আগে একই দিনে অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আকারে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এরপর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬ বিবেচনার জন্য নেওয়া হলে রুমিন ফারহানা সেটি জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন।


সম্পর্কিত খবর

;