নেত্রকোনায় কবিতার বাড়িই যেন প্রকৃতির পাঠশালা

প্রকাশ : 05 Sep 2026
নেত্রকোনায় কবিতার বাড়িই যেন প্রকৃতির পাঠশালা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি: বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের বাগান। পাশাপাশি চাষ করছেন নানা জাতের শাকসবজি, মসলা ও তেলজাতীয় ফসল। পালন করছেন হাঁস-মুরগি, কবুতর, ছাগল ও গরু। নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন কৃষানি কবিতা আক্তার। তাঁর বাড়িটি এখন শুধু বসতভিটা নয়, হয়ে উঠেছে একটি এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার বা প্রকৃতির পাঠশালা।


নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কবিতা আক্তার। পারিবারিক কৃষিই তাঁর পেশা। ছোটবেলা থেকেই মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিজের বাড়িকে বৈচিত্র্যময় কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন তিনি।


কবিতার বাড়িতে রয়েছে নানা ধরনের ফলের গাছ। আমড়া, কামরাঙ্গা, ডালিম, জলপাই, লেবু, তেঁতুল, সফেদা, চালতা, আম, জাম, আতাফল, জামরুল, কাঁঠাল, খেজুর, পেঁপে, বেল, নারকেল, জাম্বুরা, বিলিম্বি, পেয়ারা, লিচু, সুপারি, কমলা, বড়ই, কদবেলসহ বিভিন্ন দেশীয় ফলের সমাহার। তাঁর লক্ষ্য, পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফলের চাহিদা নিজেদের বাগান থেকেই পূরণ করা।


কবিতা আক্তার বলেন, “বাজারের রাসায়নিক ব্যবহার করা ফল আমি কিনে খাই না। নিজের বাগানে উৎপাদিত ফলই সন্তানকে খাওয়াই।”


প্রকৃতির মধ্যেই অনেক রোগের প্রতিকার রয়েছে বলে মনে করেন কবিতা। তাই বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছেন নানা ঔষধি গাছ। লেবু, থানকুনি, অড়হর, আপন, ধুতুরা, হরতকি, তেজপাতা, পান, বাসক, লজ্জাবতী ও নিমসহ বিভিন্ন গাছ তাঁর বাড়িতে রয়েছে। এসব উদ্ভিদের গুণাগুণ সম্পর্কে স্থানীয় মানুষকে জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় প্রথাগত জ্ঞান অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন তিনি।


বাড়ির আনাচে-কানাচে রয়েছে বিভিন্ন বনজ গাছও। এর মধ্যে বদ্দিরাজ, কালাউজা, বাঁশ, শীল কড়ই, শিমুল, বরুণ, শেউড়া, রঙ্গিসহ নানা প্রজাতির গাছ দেখা যায়। একই সঙ্গে মৌসুমভিত্তিক মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, গুয়ামুড়ি, ধনিয়া, তিল ও সরিষার মতো মসলা ও তেলজাতীয় ফসলও উৎপাদন করেন তিনি।


সারা বছরই কবিতার বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি উৎপাদিত হয়। ধুন্দল, মুখিকচু, পাটশাক, গোল আলু, মিষ্টি আলু, বেগুন, বাটিশাক, শিম, সজনে, ঢেঁড়স, কাঁচা কলা, পুঁইশাক, কচু, লাউ, লালশাক, ডাঁটা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, টমেটো, করলা, মূলা, সরিষাশাক, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, আলুশাকসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেন তিনি। মাঠে ছায়া ফসল হিসেবেও আদা, হলুদ, মাছ আলু ও গজআলু চাষ করেন।


শুধু চাষ করা ফসলেই সীমাবদ্ধ নন কবিতা। বাড়ির আশপাশে থাকা অচাষকৃত উদ্ভিদ ও শাকসবজিও তিনি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করেন। বিলাতি ধনিয়াপাতা, কলমিশাক, এলুঞ্চি, দলকলস, কচু, খুরাশাক ও কচুর লতার মতো নানা উদ্ভিদ তাঁর বাড়িতে পাওয়া যায়।


কৃষিতে রাসায়নিক উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের তৈরি জৈব উপকরণ ব্যবহার করেন কবিতা। ফসল উৎপাদনে কেঁচো কম্পোস্ট, কুইক কম্পোস্ট, গোবর ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করায় এলাকাতেও তাঁর সুনাম রয়েছে। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করছেন।


কবিতার বাড়িটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছেও পরিচিত একটি কৃষি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে। প্রকৃতিকে জানা, চেনা ও বোঝার জন্য শিক্ষার্থীরা তাঁর বাড়িতে আসে। বিভিন্ন গাছ ও ঔষধি উদ্ভিদ সম্পর্কে জানতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষক-কৃষানিরাও এখানে আসেন। স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ, সবজি চাষের কৌশল এবং কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কৃষকরাও তাঁর বাড়িতে আসেন।


একটি বাড়ির সীমিত জায়গাকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে কীভাবে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বাড়তি আয় করা যায়, তার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছেন কবিতা আক্তার।


কবিতার এই উদ্যোগ শুধু একটি পরিবারের খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা তৈরিই করছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যার চর্চাকেও উৎসাহিত করছে। তাঁর বাড়িটি তাই ক্রমেই হয়ে উঠছে “প্রকৃতির পাঠশালা”, যেখানে বইয়ের পাতার বদলে প্রকৃতি ও কৃষিই মানুষকে শেখাচ্ছে টেকসই জীবনযাপনের পাঠ।


সম্পর্কিত খবর

;