লুতুব আলি:
ভাষা যখন মায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখে, তখন তার নাম বাংলা। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ভাষাকেই বারবার ‘সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, ইউনেস্কোর এক পর্যবেক্ষণে উচ্চারণের কোমলতা, ধ্বনির সুরেলা গতি আর কাব্যগুণের জন্য বাংলাকে ‘Sweetest Language of the World’ বলা হয়েছে। সরকারি কাগজে আনুষ্ঠানিক সিল খুঁজতে গিয়ে অনেকে খালি হাতে ফেরেন। তবু কোটি বাঙালির কান, একুশের মিছিলের স্লোগান আর রবীন্দ্রসংগীতের সুর জানে - বাংলা সত্যিই মধুর। এই মাধুর্যই বাংলার প্রথম বৈশ্বিক পরিচয়।
বাংলা কেন শ্রুতিমধুর?
উত্তর লুকিয়ে আছে ভাষার গঠনে। মহাপ্রাণ বর্ণের ব্যবহার, স্বরবর্ণের উন্মুক্ত উচ্চারণ, যুক্তবর্ণের সাবলীল প্রবাহ - সব মিলে কানে বাজে সেতারের মতো। ‘মা’, ‘আলো’, ‘জল’, ‘ভালোবাসা’ - শব্দগুলো মুখে আনলেই তা টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন ‘আমার সোনার বাংলা’, তখন কথা আর সুর মিলেমিশে একাকার হয়। নজরুল যখন বলেন ‘চল চল চল’, তখন বিদ্রোহও গানের রূপ নেয়। এই ধ্বনিগত মসৃণতাই বিশ্বের মঞ্চে বাংলাকে স্বতন্ত্র করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ার পর স্পষ্ট হয়, মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়ার ইতিহাসও এই মাধুর্যেরই অংশ।
মিষ্টতা থাকলেই কি টিকে থাকা যায়?
ভাষার টিকে থাকতে লাগে বয়সের ভিত, গভীর শিকড় আর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেখান থেকেই শুরু ত্রিপুরার লড়াই। অনেকের ধারণা ছিল চর্যাপদই বাংলার আদি নিদর্শন। এর আগে নাকি কিছু নেই। কলকাতার একাংশ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ধরে বললেন, “আর খোঁজার দরকার নেই”। তখনই জেগে ওঠে ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমি। তারা থেমে থাকেনি। পুরনো পুঁথি, তাম্রলিপি, শিলালেখ ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ করে। সেই প্রমাণ নিয়ে তারা যায় ILSR-এর পরিচালক স্বাতী গুহ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। যৌথ গবেষণায় উঠে আসে - ভাষা হিসেবে বাংলার বয়স আড়াই হাজার বছর। চর্যাপদ সাহিত্যের সূচনা চিহ্ন, কিন্তু কথ্য বাংলা তারও দেড় হাজার বছর আগে থেকে বহমান।
ত্রিপুরার নেতৃত্বে ধ্রুপদী স্বীকৃতি
এই উদ্যোগের সামনে ছিলেন ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির সচিব কৃষ্ণকুসুম পাল। ‘চৌতারা’ কবিতার স্রষ্টা তিনি। লেখায় যেমন প্রতিবাদ, কাজেও তেমন দৃঢ়তা। তাঁর নেতৃত্বে আকাদেমি প্রয়োজনীয় নথি সাজিয়ে ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে একসাথে আনে। দুই রাজ্যের যৌথ প্রস্তাব পাঠানো হয় কেন্দ্রে। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা দেয় - বাংলা এখন ধ্রুপদী ভাষা। এর ফলে গবেষণার জন্য বরাদ্দ ও নতুন সুযোগের পথ খোলে। যাকে অনেকে প্রান্তিক ভাবত, সেই ত্রিপুরাই বাংলার কপালে ধ্রুপদী তিলক এঁকে দেয়। ত্রিপুরা সজাগ হয়েছে বলেই বাংলা নতুন করে জেগেছে।
ধ্রুপদী মর্যাদা পাওয়ার পর দায়িত্ব বাড়ল
মুকুট মাথায় ওঠা মানে লড়াই শেষ নয়। বরং চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। ‘মধুরতম’ খ্যাতি আর ধ্রুপদী স্বীকৃতি ধরে রাখতে কাজ শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকে। এখন অনেক পরিবারে শিশুরা ‘মা’ ডাকতে সংকোচ বোধ করে। ইংরেজি মাধ্যমের আকর্ষণে বাংলা অবহেলিত হচ্ছে। চাকরির বাজারের দোহাই দিয়ে মাতৃভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। যে ভাষার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, যে ভাষার জন্য ত্রিপুরা রাত জেগে কাজ করেছে, সেই ভাষাই নিজের উঠোনে অচেনা হয়ে যাচ্ছে। এই সংকট কাটানোর দায় ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমি, কৃষ্ণকুসুম পাল এবং সব বাঙালির।
বাংলাকে এগিয়ে নিতে পাঁচটি পদক্ষেপ
প্রথমত, শিক্ষায় বাংলাকে বাধ্যতামূলক করা। কেবল দ্বিতীয় ভাষা নয়, চিন্তা ও শেখার প্রধান মাধ্যম হিসেবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিতে বাংলার সহজলভ্যতা। মোবাইল কিবোর্ড, এআই টুল, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট - সবখানে যেন বাংলা ব্যবহার সহজ হয়।
তৃতীয়ত, প্রাপ্ত বরাদ্দ দিয়ে হাজারো পুঁথি ডিজিটাইজ করা, অভিধান আধুনিক করা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য বৃত্তি চালু করা।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক বাজার তৈরি। বাংলা বই, সিনেমা, ডিজিটাল কনটেন্ট যেন বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়।
পঞ্চমত, আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনা। ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার পরিচয়’ - এই উচ্চারণ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া।
ত্রিপুরা বাংলা আকাদেমির ‘বাংলা জননী’ পত্রিকা এই সংগ্রামের ঘোষণাপত্র। প্রচ্ছদে মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশ, পটচিত্রের ঐতিহ্য আর ছড়িয়ে থাকা বর্ণমালা। এই চিত্র বলে - বাংলা শুধু অতীত নয়, বাংলা উৎসব, শিল্প আর আগামীর সম্ভাবনা। সম্পাদক কৃষ্ণকুসুম পাল মনে করেন, জননী শুধু জন্ম দেয় না, আগামী হাজার বছরের পথও তৈরি করে দেয়।
মুকুটের ওজন আর সিংহাসনের দায়িত্ব - দুটোই এখন ত্রিপুরার কাঁধে। মধুরতম সুর আর ধ্রুপদী গৌরব - দুই হাতে দুই আলো নিয়ে জননী বাংলা পথ দেখাচ্ছে। এই আলো নিভতে দেওয়া যাবে না। কারণ ভাষা বাঁচলেই পরিচয় বাঁচে, আর পরিচয় বাঁচলেই জাতি বাঁচে।
বিল্লাল বিন কাশেম:বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। সংবাদপত্রের পাতা, টেলিভিশনের টকশো, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই অর্থনীতি একটি আলোচিত ...
লুতুব আলি:২০০ বছর ধরে চিড়িয়াখানার সংজ্ঞা ছিল একটাই - খাঁচা। বন্যপ্রাণীকে ধরে এনে মানুষকে দেখানো। লন্ডন চিড়িয়াখানা এবার সেই সংজ্ঞা ভেঙে দিল। অপারেশন থিয়েটারের সার্জনের ছুরি থেকে এবার সোজা দর্শকের ...
নাসরীন জাহান লিপি:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পে দেখিয়েছিলেন, কিশোর বয়সের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। এই বয়সটাকে বয়ঃসন্ধিকাল, কৈশোরÑ যত রকমের গালভরা নাম দেই না কেনো, ভুক্তভোগীমাত্র জানেন, এ আসলে ...
রাহাদ সুমন,বরিশাল প্রতিবেদক: নাড়ী ছেড়া ধন সন্তানের সুখের জন্য নিজের সুখ আর স্বপ্ন বিলিয়ে দিতে পারেন যিনি তিনি হলেন মমতাময়ী মা। অথচ সন্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের সুখের খোঁজে ভুলে যাচ্ছেন সেই মাকেই। আর তা ...
সব মন্তব্য
No Comments