মানিক লাল ঘোষ:
মাঘের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে মর্ত্যলোকে মূর্ত হয়ে ওঠেন বিদ্যা, সুর ও কলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী। বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর আঙিনায় সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি শিক্ষা, শিল্প এবং মননশীলতার এক চিরন্তন উৎসব। তবে এই পূজার যে রূপটি সবচেয়ে বেশি গভীর, তা হলো দেবীর শ্বেতশুভ্র বা সাদা অবয়ব—যা মূলত নির্মল জ্ঞান এবং পবিত্রতারই এক জীবন্ত প্রতীক।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দেবী সরস্বতী শুভ্রবস্ত্রাবৃতা। তাঁর এই সাদা রঙের মাঝে মিশে আছে অগাধ শান্তি ও স্বচ্ছতা। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় দেবীর বাহন ‘হংস’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হংস যেমন জল ও দুধের মিশ্রণ থেকে কেবল দুধটুকু গ্রহণ করে জল ত্যাগ করে, তেমনি প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ হলো অসার জগত থেকে সারবস্তু বা সত্যকে আহরণ করা। দেবীর হাতের বীণাটি হলো সুর ও ছন্দের প্রতীক, যা মানব হৃদয়ের ঝংকারকে জাগিয়ে তোলে। অন্যদিকে, তাঁর শুভ্র পোশাক নির্দেশ করে যে, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন এক স্বচ্ছ ও নিষ্কলুষ অন্তর।
সরস্বতী পূজার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। ছোটদের জন্য এই দিনটি অত্যন্ত বিশেষ, কারণ এদিন ‘হাতেখড়ি’র মাধ্যমে বর্ণমালার সাথে তাদের প্রথম পরিচয় ঘটে। অন্যদিকে, পরীক্ষার্থীদের কাছে এটি মায়ের চরণে কলম আর প্রবেশপত্র (Admit Card) রেখে আশীর্বাদ চাওয়ার এক পরম লগ্ন। পূজার এই দিনটি মূলত নিজেকে শুদ্ধ করার দিন। দেবীর চরণে বই-খাতা অর্পণ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আসলে নিজেদের মেধা ও মননকে উচ্চতর সত্যের কাছে সঁপে দেয়।
বাঙালি সংস্কৃতিতে সরস্বতী পূজা এক অনন্য সামাজিক মাত্রা পেয়েছে। আজকাল অনেক ভক্তই বসন্তের চটকদার রঙের চেয়ে দেবীর প্রিয় সাদা রঙকেই প্রাধান্য দেন। শুভ্র বসন পরে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া কেবল ঐতিহ্যের অংশ নয়, এটি অন্তরের পবিত্রতা প্রকাশেরও এক মাধ্যম। ঢাকের আওয়াজ, পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্রোচ্চারণ আর প্রসাদী খিচুড়ির সুবাসে যে মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়, তা আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে জ্ঞানতৃষ্ণায় এক হওয়ার শিক্ষা দেয়।
আজকের তথ্যের বিস্ফোরণের যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু অভাব রয়েছে প্রকৃত প্রজ্ঞার। দেবী সরস্বতীর আরাধনা আমাদের শেখায় তথ্য নয়, বরং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে সত্যকে চেনা। সরস্বতী পূজা হলো কোলাহলমুক্ত শান্ত জ্ঞানচর্চার আবাহন। যখন চারদিকে অসহিষ্ণুতা বা অপসংস্কৃতির মেঘ জমে, তখন বাগদেবীর বীণার ঝংকারই পারে আমাদের মনে শুভচেতনা ও রুচিবোধ ফিরিয়ে আনতে।
“সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে”—এই মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে আমরা কেবল পরীক্ষায় পাসের বর চাই না, বরং চাই একটি আলোকিত সমাজ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সরস্বতী পূজা বাঙালির প্রাণের উৎসব। বীণাপাণির আরাধনা কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে না থেকে আমাদের প্রতিদিনের জ্ঞানতৃষ্ণায় পরিণত হোক। দেবী সরস্বতীর শুভ্র জ্যোতি আমাদের জীবনকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যাক।
-লেখক:মানিক লাল ঘোষ :- সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এর সাবেক সহ সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
মোঃ খালিদ হাসান:বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাপদাহ, বায়ুদূষণ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃ ...
মোঃ মামুন হাসান:পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মহিমান্বিত শিক্ষাই এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য। হযরত ই ...
আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল:প্রতিদিন সকাল হলেই ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল কিংবা গুলিস্তানের ফুটপাতগুলোতে চেনা এক ব্যস্ততার ছবি চোখে পড়ে। একপাশে পথচারীদের ভিড়, অন্যপাশে হকারদের হাঁকডাক। এই হট্টগোলের ভেতরেই প্রতিদিন ...
মানিক লাল ঘোষ:মৃত্যু অমোঘ, কিন্তু কিছু মৃত্যু পুরো একটি জনপদকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ সাক্ষী হলো তেমনই এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্তের। লাখো ...
সব মন্তব্য
No Comments