সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত

প্রকাশ : 19 Jun 2026
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বুরগেনস্টক রিসোর্টে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স তার নির্ধারিত জেনেভা সফর বাতিল করেছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, “এই আলোচনার লজিস্টিক কখনোই সহজ বা অনুমানযোগ্য ছিল না।” তিনি আরও জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এবং মার্কিন প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিল। পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই তারা রওনা দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু “আপাতত ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ রাতে যাচ্ছেন না।” 


সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, “যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিকল্পিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড এই আলোচনা সহজতর করতে প্রস্তুত রয়েছে। বুরগেনস্টকে প্রাসঙ্গিক প্রস্তুতিমূলক কাজ অব্যাহত আছে।” 


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়। এতে অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। 


এরপর গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকে (MoU) সই করে। এতে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে এবং ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল দেবে। বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 


প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার প্যারিসের বাইরে এক নৈশভোজে এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরান থেকে ভার্চুয়ালি চুক্তিতে সই করেন। এরপর শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ও টেকনিক্যাল আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। 


ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানি আলোচকরা সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখতে চেয়েছিল। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। 


অন্যদিকে দ্য টাইমস জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরান আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ায়। তেহরানের অভিযোগ, ইসরায়েলের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা চুক্তির লঙ্ঘন। ইসরায়েলি হামলায় বৃহস্পতিবার রাতে লেবাননে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়। পাল্টা হামলায় ৪ ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছে। 


ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা তেহরানের ‘রেড লাইন’ মেনেই চলবে। “শত্রু যদি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে পাল্টা জবাব দিতে আমাদের আঙুল ট্রিগারে আছে।” 


হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, “পরবর্তী ধাপের টেকনিক্যাল আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। মার্কিন প্রতিনিধিদল প্রথম সুযোগেই রওনা দিতে প্রস্তুত।” 


ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, ইরান ‘সম্পূর্ণ সম্মতি ও আচরণ পরিবর্তন’ না করলে ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিলের কোনো সুবিধা পাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন করদাতাদের “একটি পয়সাও” খরচ হবে না। 


সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে সুইস দূতাবাস তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখভাল করে। 


আলোচনা স্থগিতের খবরে ইউরোপের শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে আসছেন। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস রয়ে গেছে। ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে না যাওয়ায় প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হলো। 


১৪ দফার সমঝোতায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর নৌ অবরোধ তুলে নেবে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে পুনরায় নিশ্চিত করেছে। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। 


তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সি ইস্যুগুলো এখনো আলোচনার বাইরে রয়েছে। 


সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনার নতুন তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবে তারা মধ্যস্থতা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।


সম্পর্কিত খবর

;