জাতিসংঘের রিপোর্ট
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল-কায়েদার দক্ষিণ এশীয় শাখা আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর কর্মকাণ্ড, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সম্ভাব্য বৈদেশিক অভিযান নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ নিষেধাজ্ঞা কমিটির অধীন বিশ্লেষণ ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ৩৭তম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, AQIS এখনো আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সক্রিয়। সংগঠনটির ওপর হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রভাব রয়েছে। প্রতিবেদনে AQIS-এর আমির ওসামা মাহমুদ এবং তার ডেপুটি ইয়াহিয়া গৌরির অবস্থান কাবুলে বলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির মিডিয়া সেল হেরাতে রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
জাতিসংঘের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, AQIS ক্রমেই বৈদেশিক বা ‘external operations’-এর দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছে। এ ধরনের অভিযান সরাসরি AQIS-এর নামে স্বীকার না করে অন্য কোনো ছাতার সংগঠন বা আড়াল ব্যবহার করে পরিচালিত হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে আফগানিস্তানে তাদের আশ্রয়দাতা তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমানো।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের জায়গাটি আরও পুরোনো। AQIS প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশকে তাদের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী সংগঠনবিষয়ক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে আল-কায়েদার তৎকালীন নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি AQIS প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার সময় বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং ভারতের কয়েকটি অঞ্চলকে সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের আওতায় উল্লেখ করেছিলেন।
বাংলাদেশে AQIS-এর সঙ্গে স্থানীয় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের যোগাযোগের অভিযোগও নতুন নয়। বিশেষ করে আনসার আল-ইসলাম বাংলাদেশকে AQIS-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশভিত্তিক এই সংগঠনটি ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক, ব্লগার ও অন্যদের হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিল এবং এসব হত্যাকাণ্ডের দায় AQIS স্বীকার করেছিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার নথিতেও ২০১৫ সালের কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে আনসার আল-ইসলাম ও AQIS-এর নাম এসেছে। ওই নথিতে ঢাকায় প্রকাশক ও লেখক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যাকাণ্ড এবং প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে হামলার দায় AQIS-সংশ্লিষ্ট আনসার আল-ইসলাম দাবি করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
২০১৬ সালের পর বাংলাদেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা ও সংগঠিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হওয়ায় AQIS-ঘনিষ্ঠ স্থানীয় নেটওয়ার্কগুলোর সক্ষমতা অনেকটাই কমে আসে। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বারবারই বলা হয়েছে, সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে গেলেও মতাদর্শ, অনলাইন প্রচার এবং ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুনর্গঠনের ঝুঁকি থেকে যায়।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই ঝুঁকির আঞ্চলিক দিকটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। AQIS আফগানিস্তানে অবস্থান করলেও তাদের লক্ষ্য কেবল আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ২০২৩ সালের জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছিল, একটি সদস্যরাষ্ট্রের মূল্যায়ন অনুযায়ী AQIS-কে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, জম্মু-কাশ্মীর ও মিয়ানমারে কর্মকাণ্ড বিস্তারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
তবে এ ধরনের মূল্যায়নের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে বর্তমানে AQIS-এর বড় ধরনের সক্রিয় সশস্ত্র কাঠামো রয়েছে। বরং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় হচ্ছে—আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আল-কায়েদা ও এর আঞ্চলিক সহযোগী সংগঠনগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আবারও যোগাযোগ, প্রচারণা, নিয়োগ ও নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করতে পারে কি না।
এদিকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় গত এক দশকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের কারণে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন, বিদেশে থাকা উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সহিংস কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আল-কায়েদা এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হামলা চালানোর আকাঙ্ক্ষা ধরে রেখেছে। সংগঠনটি তুলনামূলক কম প্রযুক্তিনির্ভর হামলার পরিবর্তে এমন হামলার দিকে ঝুঁকতে পারে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাবে। একই সঙ্গে AQIS-এর বৈদেশিক অভিযানমুখী প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে সীমান্তের বাইরে থাকা জঙ্গি নেতৃত্বের সঙ্গে দেশের ভেতরের বিচ্ছিন্ন উগ্রবাদী ব্যক্তিদের যোগাযোগ। বিশেষ করে আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চলে AQIS-এর উপস্থিতি বজায় থাকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাদের পুরোনো যোগাযোগ থাকায় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে AQIS-কে আল-কায়েদার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সহযোগী হিসেবে দেখা হয়। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি মূল্যায়নেও সংগঠনটির সঙ্গে আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, আফগান তালেবান এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর আওতায় আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-সংগঠনের বিরুদ্ধে সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। জাতিসংঘের হালনাগাদ তালিকায় বর্তমানে ২৪৯ ব্যক্তি ও ৮৮টি সত্তা রয়েছে। সর্বশেষ তালিকাটি ২০২৬ সালের ৮ জুলাই হালনাগাদ করা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে সরাসরি ‘বাংলাদেশে আল-কায়েদার সক্রিয় ঘাঁটি তৈরি হয়েছে’—এমন সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, আল-কায়েদা ও AQIS এখনো সক্রিয়, তাদের বৈদেশিক অভিযান পরিচালনার আগ্রহ রয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের পুরোনো নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে অনলাইন উগ্রবাদী প্রচারণা শনাক্তকরণ, বিদেশি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের পুনর্গঠনের সম্ভাবনা ঠেকানো।
স্টাফ রিপোর্টার: ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে। সফরের সম্ ...
স্টাফ রিপোর্টার: আগামী ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপ ...
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, তা নিজেদের চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা ও দেশে জ্বালানির প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা ...
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ পুলিশের ৭ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও ৪৯ পুলিশ পরিদর্শকসহ মোট ৫৬ কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ...
সব মন্তব্য
No Comments