ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে ধোঁয়াশা, ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবার

প্রকাশ : 18 Jul 2026
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে ধোঁয়াশা, ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবার

যশোর অফিস: ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য গত কয়েক দিন ধরে ভাঙা হচ্ছে। তবে কার নির্দেশে, কোন সংস্থার উদ্যোগে এবং কী কারণে এই কাজ চলছে—সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারছে না জেলা প্রশাসন, পৌরসভা কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকরা ভাস্কর্যের বেষ্টনী ও মূল অংশ জ্যাকহ্যামার দিয়ে ভাঙছেন। 


স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরেই অপসারণের কাজ চলছে। শ্রমিকদের দাবি, ওই স্থানে প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটায় পৌরসভার উদ্যোগে এটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। তবে ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় এ দাবি নাকচ করে বলেছেন, ‘এ কাজটি কে করছে আমরা জানি না। পৌরসভার পক্ষ থেকে এটি করা হচ্ছে না।’ ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খানও জানিয়েছেন, কেন ভাঙা হচ্ছে তা তাঁর জানা নেই এবং বিষয়টি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। 


জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘এটা যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, তা জানা ছিল না। কারণ এটি অসম্পূর্ণ ছিল। জেলা প্রশাসন এ কাজ করছে না।’ তিনি আরও জানান, দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এটি ওই স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, জেলা পুলিশ লাইনসের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। 


তবে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমানও বলেছেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ভাস্কর্য ও চত্বরটি কারা অপসারণ করছে, তা তাঁর জানা নেই। জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মাজিদ জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা দুই দফায় স্থাপনাটিতে ভাঙচুর চালিয়েছিল। পাশাপাশি এটি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সৃষ্টি করছিল। বিভিন্ন সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তবে এখন কে অপসারণ করছে, তা তিনি জানেন না। তিনি আরও জানান, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।


বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা কামলুজ্জামান বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহ নয়, সারা দেশের গর্ব। তার স্মৃতিচিহ্ন অপসারণ করা হচ্ছে, এটি দুঃখজনক। দ্রুত এটি একই স্থানে বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে।’


বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই চত্বর অপসারণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার চাচা দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। আমাদের না জানিয়ে এটি অপসারণ করা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’ তিনি দ্রুত নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।


জানা যায়, ঝিনাইদহ পৌরসভা ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কাজ শেষ না করেই প্রকল্পটি ফেলে রাখা হয়। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় চত্বরটি আগাছায় ঢেকে যায় এবং স্থাপনাটি অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। এর আগে ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত এই স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ ও সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। 


প্রসঙ্গত, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হন। অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধি লাভ করেন। জেলার সুশীল সমাজের দাবি, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ঝিনাইদহের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রতি সম্মান জানিয়ে অন্যত্র কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্যটি দ্রুত স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।


সম্পর্কিত খবর

;