ফ্যামিলি কার্ড: পরিবারের শক্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ

প্রকাশ : 16 Aug 2026
ফ্যামিলি কার্ড: পরিবারের শক্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ

এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ:


পরিবারের সুখ-দুঃখ কখনো এর একজন সদস্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের একজন সদস্যের আয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে সবার জীবনে। আবার একটি সন্তান ভালো শিক্ষা পেলে তার সুফলও ভোগ করে পুরো পরিবার। আবার একটি পরিবারের সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়ন মানে শুধু কয়েকজন মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন নয়। বরং সেটি পারিপার্শ্বিক সমাজকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভিন্ন ভাতা ও কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো মানুষ সরকারি সহায়তা পেয়েছেন। এসব উদ্যোগ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি বিষয় আরও স্পষ্ট হয়েছে যে দারিদ্র্য বা আর্থিক সংকট শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়, বরঞ্চ এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।


ধরা যাক, একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে শুধু তার আয়ই বন্ধ হয় না, সন্তানের পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে, পরিবারের খাদ্য ব্যয় কমে যেতে পারে, এমনকি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। আবার কোনো নিম্ন আয়ের পরিবার নিয়মিত সরকারি সহায়তা পেলে সেই অর্থ দিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সাথে সাথে, সন্তানদের লেখাপড়া, পুষ্টি ও চিকিৎসার দিকেও মনোযোগ দিতে পারে। অর্থাৎ একটি পরিবারকে শক্তিশালী করা মানেই সেই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করা।


এই বাস্তবতা থেকেই এসেছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির ধারণা। সরকারের নতুন এই উদ্যোগের মূল দর্শন—“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।” অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারকে বিবেচনায় এনে সহায়তা দেওয়া হবে। কারণ একটি পরিবারের উন্নয়ন হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভাবনা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন কর্মসূচিতে একজন ব্যক্তি ছিলেন সহায়তার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পুরো পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। ফলে শিশু, নারী, প্রবীণসহ পরিবারের সব সদস্যই পরোক্ষভাবে এই সহায়তার সুফল ভোগ করবেন। সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেটি হবে আরও সমন্বিত, আরও কার্যকর এবং মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যাত্রা স্বাধীনতার পরপরই। এত বছর ধরে সরকারের অসহায়দের জন্য সহায়তা প্রদান কার্যক্রম চলার পরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। দেশে নানা প্রকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও কেন অনেক গরীব-সম্বলহীন পরিবার এখনও সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে? এর একটি বড়ো কারণ হলো বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য আলাদা আলাদা উপকারভোগীর তালিকা। অনেক সময় দেখা যায়, একই পরিবারের একাধিক সদস্য ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা পেলেও আরেকটি সমানভাবে দরিদ্র পরিবার কোনো সহায়তাই পায় না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ জন্য তথ্যভান্ডার তৈরি ও পরিচালনার কারণে একই ব্যক্তি একাধিকবার সুবিধা পাওয়ার বা প্রকৃত উপকারভোগী বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।


এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই পরিবারভিত্তিক একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারি সহায়তা আরও সঠিকভাবে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও হবে আরও সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত। একটি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল পরিবার নিজের বর্তমান প্রয়োজন পূরণের সাথে সাথে ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুতি নিতে পারে। সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা গ্রহণ কিংবা ছোটখাটো উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই পরিবারকে শক্তিশালী করার অর্থ শুধু একটি পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন নয়, বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অগ্রগতির ভিত্তিকে আরও মজবুত করা।


ফ্যামিলি কার্ড এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ার। তবে এই কর্মসূচি শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি সেবা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমও হবে আরও সমন্বিত। ফলে সাধারণ মানুষের যেমন ভোগান্তি কমবে, তেমনি সরকারি সেবাও আরও দ্রুত ও সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।


ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আরেকটি বিশেষ দিক হলো, কার্ডটি সাধারণত পরিবারের মা বা নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা রয়েছে। পরিবার পরিচালনায় নারীরা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা  পালন করেন। সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলোতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছালে তা পুরো পরিবারের কল্যাণেই কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।


ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়েছে। এ জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আয়, বসতবাড়ির অবস্থা, জমিজমা, সম্পদ, শিক্ষার অবস্থা এবং অন্যান্য আর্থ-সামাজিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি পরিবারকে একটি পিএমটি স্কোর দেওয়া হয়। সেই স্কোরের ভিত্তিতেই অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করা হয়। ফলে ব্যক্তিগত সুপারিশ বা প্রভাবের পরিবর্তে তথ্যের ভিত্তিতেই উপকারভোগী নির্বাচন করা সম্ভব হয়। এই কর্মসূচির আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি উপকারভোগী পরিবারের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা হচ্ছে। এতে পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ থাকবে এবং প্রয়োজনে সহজেই তা হালনাগাদ করা যাবে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এই তথ্য ব্যবহার করে আরও দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে। এতে একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজনও অনেকটাই কমে আসবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগী প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি ওয়ান-আইডি বা একক পরিচয় নম্বরও চালু করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র যেমন একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে, তেমনি ওয়ান-আইডি একটি পরিবারের পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সহজেই জানতে পারবে একটি পরিবার কোনো কোনো সরকারি সেবা পাচ্ছে। এতে একই পরিবারের নামে বারবার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমবে এবং অধিক সংখ্যক প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হবে।


ফ্যামিলি কার্ডে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কার্ডে থাকবে কন্টাক্টলেস চিপ, কিউআর কোড এবং এনএফসি বা নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই কার্ডধারীর পরিচয় যাচাই করা যাবে। ফলে সরকারি সেবা নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা বা অতিরিক্ত কাগজপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে। আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে ডিজিটাল ব্যবস্থা। উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের কাছে সরাসরি অর্থ পাঠানো হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে এবং সহায়তার অর্থ দ্রুত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছাবে। পাশাপাশি অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়াও আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।


ইতোমধ্যে এই কর্মসূচির প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু মাসিক সহায়তা প্রদান নয়। এর মাধ্যমে এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে। ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু একটি নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি মূলত পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।


একটি আধুনিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করে তোলা। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সেই লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে। পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা আরও দ্রুত, সহজ এবং সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারের জন্যও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা আরও সহজ হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি পরিবারের প্রয়োজন, অবস্থা এবং প্রাপ্ত সেবার তথ্য একই ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর হবে। নিয়মিত তদারকি, তথ্য হালনাগাদ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মানুষ। আর মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো পরিবার। সেই পরিবারকে আরও সুরক্ষিত, স্বাবলম্বী ও সক্ষম করে তুলতেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির যাত্রা। এটি শুধু একটি কার্ড নয়, বরং পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও মানবিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।


#


-লেখক: পরিচালক (মিডিয়া), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।


পিআইডি ফিচার

সম্পর্কিত খবর

;