শেখ হাসিনার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : 16 Aug 2026
শেখ হাসিনার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। তবে ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ায় ওই সফরের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।


রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এসব কথা বলেন। তিনি জানান, তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।


শহীদুল করিম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।’


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত নির্দিষ্ট কোনো তারিখে চূড়ান্ত হয়নি। সফরটি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


এর আগে জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, অনুকূল পরিবেশ এবং প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ ও দ্বিপক্ষীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।


তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।


তবে একই সময়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান এবং এরপর থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে তাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও ঢাকা বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে।


শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকার দৃষ্টিতে, ভারতে অবস্থানরত একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার জন্য অনুকূল নয়।


এ কারণে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের ক্ষেত্রে কেবল আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ বা কূটনৈতিক যোগাযোগই যথেষ্ট নয়, বরং সফরটি সফল করার মতো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।


ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, ভিসা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর রাখতে এসব বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।


সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি ঘটনায়ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দেয়। জুনে প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ যাচাইয়ের জন্য আটকে রাখার ঘটনায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম তখন ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারকে ডেকে বাংলাদেশের ‘গভীর অসন্তোষের’ কথা জানান।


ওই ঘটনার পরও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাই বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।


এদিকে তারেক রহমানের প্রথম দিকের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় স্বার্থ ও দ্বিপক্ষীয় প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জুনে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। চীন সফরের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ওই সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।


কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে সফরটি শুধু সৌজন্য সফর না হয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট কমানো এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরুর সুযোগও তৈরি করতে পারে।


তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোববারের বক্তব্যে আপাতত একটি বিষয়ই স্পষ্ট—তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যোগাযোগ থাকলেও সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করাকে এখন প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে ঢাকা। শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য সেই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেই মনে করছে বাংলাদেশ।


ফলে তারেক রহমান কবে নয়াদিল্লি সফর করবেন, আদৌ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সফরটি হবে কি না এবং সফরের আগে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কী ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা হয়—সেদিকেই এখন নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পর্কিত খবর

;