শীতল পাটির গ্রাম আজ অস্তিত্ব সংকটে: ঐতিহ্য আঁকড়ে অর্ধশত পরিবার

প্রকাশ : 18 Jun 2026
শীতল পাটির গ্রাম আজ অস্তিত্ব সংকটে: ঐতিহ্য আঁকড়ে অর্ধশত পরিবার

হাসান মামুন, পিরোজপুর অফিস: পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রাম একসময় ‘শীতল পাটির গ্রাম’ নামে পরিচিত ছিল। কচা নদীর তীরে অবস্থিত এ গ্রামে শত শত পরিবার শীতল পাটি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাব, প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার, কাঁচামালের সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এ কুটিরশিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বর্তমানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে।


বাংলার ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি শুধু একটি কুটিরশিল্প নয়, এটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই এর ব্যবহার ছিল। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরও শিল্পটির উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।


সরেজমিনে সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ মিলেই পাটি বুনন, পাইত্রা প্রস্তুত ও নকশার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে কাঁচামাল ‘পাইত্রা’র তীব্র সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। একসময় যে পাইত্রা অল্প দামে পাওয়া যেত, বর্তমানে তার দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।


শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর সজল দে, দীপালী রানী, অনিল চন্দ্র পাটিকর ও আরতি রানী জানান, পাটি বিক্রি করে সংসার চালানো এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কাঁচামালের উচ্চমূল্য, বাজার সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তবে সংকটের মধ্যেও কারিগররা হাল ছাড়েননি। শীতল পাটি দিয়ে এখন তারা টিস্যু বক্স, পেন্সিল হোল্ডার, ব্যাগ, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ল্যাম্পশেড, পাখির বাসা, ডাইনিং ম্যাটসহ বিভিন্ন নান্দনিক ও ব্যবহারিক পণ্য তৈরি করছেন। এতে নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।


স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এ শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে।


বিসিক পিরোজপুর কার্যালয় সূত্র জানায়, শীতল পাটির পাশাপাশি বর্তমানে এ গ্রামের কারিগররা পাটি দিয়ে ৪০টিরও বেশি ধরনের শৌখিন ও ব্যবহারিক পণ্য তৈরি করছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।


বাংলার ঐতিহ্যের ধারক সুবিদপুরের শীতল পাটি শিল্প আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে। যথাযথ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ না নেওয়া হলে কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যেতে পারে। তাই শিল্পটিকে রক্ষা করা শুধু কয়েকটি পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও দায়িত্ব।


সম্পর্কিত খবর

;