জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে বাসদ (মার্কসবাদী)'র আলোচনা সভা

প্রকাশ : 31 Jul 2026
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে বাসদ (মার্কসবাদী)'র আলোচনা সভা

স্টাফ রিপোর্টার: আজ ৩১ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, বিকাল ৪ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ৩য় তলায় আব্দুস সালাম হলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী)'- দলের উদ্যোগে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্খা, প্রাপ্তি ও আমাদের করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা এর সভাপতিত্বে আলোচনা করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু এবং বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সদস্য জয়দীপ ভট্টাচার্য। 

আলোচনা সভায় অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন-  'বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস। গণঅভ্যুত্থানগুলোর সাথে শাসকদের 'উন্নয়ন' দর্শন সম্পর্কিত। আইয়ুব খান, এরশাদ, হাসিনা সবাই উন্নয়নের কথা বলে অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন করার পরপরই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। কারণ এসকল উন্নয়নের মাধ্যমে পুঁজিপতিদের লাভ হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়েছে।  এসকল ক্ষোভের ফলে গণঅভ্যুত্থান জন্ম নিয়েছে। উনসত্তরে নেতৃত্ব ও দাবি জনগণের কাছে পরিচিত ছিল, নব্বইয়েও একই অবস্থা ছিল। চব্বিশে সেরকম ছিল না তারপরেও কেন গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল?  কারণ হাসিনা তখন যেভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছিল তা-ই জনগণকে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বাধ্য করেছে। চব্বিশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল গ্রাফিতির মাধ্যমে। সেগুলোর মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। বৈষম্যহীন আকাঙ্ক্ষা মানেই বামপন্থী আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যারা ক্ষমতাসীন হয়েছে তারা সবাই বৈষম্যবাদী ডানপন্থী শক্তি। এটাই সমাজের অন্যতম দ্বন্দ্ব। ফলে বামপন্থীরা যখন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে তখন তাদের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠী নানা আক্রমণ করছে। সমাজ অভ্যান্তরের বৈষম্যহীন আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে হলে বামপন্থী রাজনীতিকে নানাদিক থেকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে হবে।'


জয়দীপ ভট্টাচার্য বলেন- 'গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল মূলত কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারীতা ও সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার ও নতজানু পররাষ্ট্র নীতির পাল্টানোর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু তারা রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার না করে রাষ্ট্রের ইতিহাসকে বিকৃত করা শুরু করেন। একইভাবে মব সন্ত্রাস, সংখ্যালঘু, মাজারে, বামপন্থীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জুলাই হত্যাকান্ডের বিচারের নামে অনেক ভুয়া মিথ্যা মামলা ও হয়রানি করে বিচার প্রক্রিয়াকে লঘু করেছে। নির্বাচন হওয়ার পর বিএনপি সরকার সর্বসম্মত সংস্কারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে এমনকি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার লঙ্ঘন করেছে। জামায়াত এনসিপিও মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর কোন পদক্ষেপ হচ্ছে না। একইভাবে বৈদেশিক প্রভাবের ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রভাব বেড়েছে। আমেরিকার সাথে অসম বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে। ভারতের সাথে অসম চুক্তিগুলো বাতিল করা হয় নাই। অর্থ্যাৎ গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয় নি। কারণ গণঅভ্যুত্থানে সঠিক নেতৃত্ব ছিল না। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। '


অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন- 'সংস্কার কার হাত ধরে হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র সংস্কারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা থাকলেও অর্থনৈতিক সংস্কার না হলে বাস্তবে সংস্কার হয় না। মানুষকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা হয় না মানুষকে অসম্মান করা হয়। রিকশাওয়ালা, প্রবাসী শ্রমিক, নারী তথা সাধারণ মানুষ সবাই অভিজাত শ্রেণীর দ্বারা অসম্মান করা হয়।  আওয়ামিলীগ সরকার যেভাবে জনগণকে অপমান করেছে এখনও একই প্রক্রিয়া চলছে। ফলে জনগণের ক্ষোভ আছে। বাম রাজনীতির কাজ হওয়া দরকার জনগণকে ক্ষমতায়িত করা। গণঅভ্যুত্থান কখনও ব্যর্থ হয় না এটা আমাদের দিকনির্দেশক। পরবর্তী আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য অনুপ্রেরণা।'


বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন- 'গণঅভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নাই। অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে আগের মত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে এই ব্যবস্থাকে চেনা জরুরি। সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়। সরকার পাল্টালেও রাষ্ট্র পাল্টায় না। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা হচ্ছে বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা যতদিন আছে ততদিন মানুষের জীবনে দূর্ভোগ থাকবেই। এবং ভুক্তভোগী মানুষ লড়াই করবে। মানুষ লড়াই করে,  জীবন দেয়। কিন্তু পরিবর্তন হয় না কেন? লড়াইয়ের সঠিক পথ ও নেতৃত্ব দরকার। মানুষের মধ্যে সেই সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। জনগণকে সচেতন শিক্ষিত করে আন্দোলনের শক্তি তৈরি করা দরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে নৈতিকতার সুর তৈরি করতে হবে। সঠিক আন্দোলনের শক্তি বাসদ (মার্কসবাদী)'র নেতৃত্বে আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে।'

সম্পর্কিত খবর

;