ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া: ঝিনাইদহের দলিল রেজিস্ট্রি অফিস

প্রকাশ : 09 Jul 2026
ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া: ঝিনাইদহের দলিল রেজিস্ট্রি অফিস

ঝিনাইদহ থেকে সুজন বিপ্লব: ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, কালীগঞ্জ, শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা অফিসে প্রকাশ্যে ঘুষ-দুর্নীতি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নকলনবিশ অ্যাসোসিয়েশন ও দলিল লেখক সমিতির কতিপয় ব্যক্তি এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জেলার সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে অতিরিক্ত টাকা ও ঘুষ লেনদেনে বাধ্য করছেন।


ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের শেষ নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি এই কার্যালয়টি ঘুষ ও অনিয়মের কারণে জেলাজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঝিনাইদহ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সহকারী জাকির হোসেন সকল অপকর্মের মূল হোতা। সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ে তিনি নানামুখী হয়রানি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


সূত্র জানায়, সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতি, সাব-রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান এর বিপরীতে। ফলে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন চলছে। অসাধু দলিল লেখকদের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ চলছে। এখানে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। এটি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।


সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে দেখা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রারের পাশে নকলনবিশ অ্যাসোসিয়েশন ও দলিল লেখক সমিতির নিয়োজিত কতিপয় ব্যক্তি রেজিস্ট্রির জন্য দলিলগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। দলিল রেজিস্ট্রি করতে সরকার নির্ধারিত আয়কর ও ভ্যাটের টাকার ব্যাংক ড্রাফট দেওয়ার পরও অতিরিক্ত ঘুষের টাকা দিতে হয়। দলিল লেখকের ফি, স্ট্যাম্প খরচ ও এন-ফিসের টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা সিন্ডিকেটের ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়। দলিলের ফি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করলেও সেরেস্তা ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রার কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করেন না। ঘুষের এই টাকা ছাড়া জমির দলিল সম্পাদিত হয় না।


অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জমির বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই টাকা সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। এছাড়া দলিলের নকল তুলতে গেলে সরকারি ফির দ্বিগুণ টাকা আদায় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রারসহ অফিসের অসাধু কর্মকর্তারা। তাদের যোগসাজশে প্রতিদিনই সেবা নিতে আসা মানুষদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।


ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং দলিল লেখক সমিতির একটি চক্র রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। যদিও ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দুর্নীতিমুক্ত—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেবাগ্রহীতা ও দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা দলিল লেখক সমিতি এবং সাব-রেজিস্ট্রারের নামে সংগ্রহ করা হয়। অতিরিক্ত টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। দলিল লেখক সমিতির নামে সিন্ডিকেট গঠন করে এই টাকা আদায় করা হয়।


অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন প্রকার দলিল রেজিস্ট্রির নামে অতিরিক্ত ঘুষ দাবির অভিযোগ জমা পড়েছে। হেবা দলিলে সরকারি খরচ মাত্র এক হাজার টাকা হলেও সেখানে আদায় করা হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এভাবে প্রতি মাসে কৃষকের রক্ত চুষে লাল হচ্ছে এই সিন্ডিকেট। বাড়ি, গাড়ি ও জমি কিনে তারা শহর ও গ্রামবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনসহ সবাই জানে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বহুবার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সদস্যরা বক্তব্য রেখেছেন। তারপরও সবাই নীরব।


মন্ত্রণালয় ও দুদকে অভিযোগ দাখিল হলেও ঘুষের টাকায় ৪ কোটি টাকার আলিশান বাড়ি বানিয়েছেন মহেশপুরের সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ‘বড় বাবু’খ্যাত সাইদুর রহমান। মহেশপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রধান অফিস সহকারী মো. সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে মো. আব্দুল্লাহ আল সৈকত নামের এক ব্যক্তি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরে অভিযোগ করেছেন।


অভিযোগে বলা হয়, সরকারি সামান্য বেতনের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও সাইদুর রহমান মহেশপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগদানের পর থেকেই দলিল লেখক ও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে ফাইলপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ঘুষ আদায় করে আসছেন। এই অবৈধ আয়ে তিনি ঝিনাইদহ পৌরসভার আরাপপুর এলাকার চাঁনপাড়া গ্রামে ৪ শতক জমির ওপর মার্বেল পাথরের একটি বিলাসবহুল ২ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া নিজ গ্রাম ফলিয়াসহ ঝিনাইদহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্ত্রী ও সন্তানদের নামে-বেনামে বিপুল জমি ও সম্পত্তি ক্রয় করেছেন এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা গোপন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর আগেও সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই তিনি অবৈধ ক্ষমতা ও কালো টাকার দাপটে পার পেয়ে যান এবং বহাল তবিয়তে দুর্নীতি চালিয়ে যান। অভিযোগকারী মো. আব্দুল্লাহ আল সৈকত বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি নিজের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচয় গোপন রেখেছেন। তিনি বলেন, তদন্ত করলেই ৪ কোটি টাকার বাড়ি ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের সত্যতা বেরিয়ে আসবে।


অভিযোগের বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্ট্রার সাব্বির আহমেদ বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান অফিস সহকারী মো. সাইদুর রহমান বলেন, অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। আমি ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, লিখিত অভিযোগটি মন্ত্রণালয়, নিবন্ধন অধিদপ্তর ও দুদক কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর থেকেই অভিযুক্ত সাইদুর রহমান আতঙ্কে রয়েছেন। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ মহল থেকে জোর তদবির শুরু করেছেন।


মহেশপুর উপজেলার এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইডি কার্ডের সঙ্গে জমির দলিলে নামের বানান ভুল থাকলে সাব-রেজিস্ট্রারকে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। দলিলপ্রতি অফিস খরচ লাখে ১০০০ টাকা করে দিতে হয়। সপ্তাহে তিন দিন—রবি, সোম ও মঙ্গলবার কার্যক্রম চলে। অফিসের সবকিছু তদারকি করেন বড়বাবু সাইদুর রহমান।


কোটচাঁদপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেও সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া দলিল হয় না। শরিকানা জমির বণ্টননামা না থাকলে প্রতি দলিলে অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এই টাকা না দিলে জমির রেজিস্ট্রেশন সম্ভব হয় না। সরকারি নিয়মে রেজিস্ট্রেশন খরচ ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও, এখানে সমিতির দোহাই দিয়ে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া শতকপ্রতি ৫০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়।


কালীগঞ্জে দলিল রেজিস্ট্রি করতে সরকারের নির্ধারিত ফির পরিবর্তে অফিস কর্তৃক নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। একটি সাফ কবলা দলিলে প্রথম লাখে দেড় হাজার টাকা, পরবর্তী ১০ লাখ পর্যন্ত প্রতি লাখে ৫০০ টাকা, ১০ লাখের ঊর্ধ্বে প্রতি লাখে ৪০০ টাকা এবং দলিলমূল্য এক কোটির ঊর্ধ্বে হলে আলোচনার মাধ্যমে রেট ঠিক করা হয়। ওয়ারিশ সম্পত্তি হলে মাথাপ্রতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। দানপত্র, হেবা, এওয়াজ বদল, বণ্টননামা, না-দাবি দলিলসহ সব ধরনের দলিল রেজিস্ট্রিতে ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। দলিলে দাতা বা গ্রহীতা অথবা জমির কোনো সমস্যা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।


শৈলকুপা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম, ঘুষ ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিন ধরে চলছে। অভিযোগ রয়েছে, একজন নকলনবিশ একটি নকলও না লিখে বিপুল অর্থ-সম্পদ ও বাড়ির মালিক হয়েছেন। পিয়ন, সহকারী, কর্মচারী, মোহরার ও সাব-রেজিস্ট্রার—সবাই সিন্ডিকেটের অংশ।


হরিণাকুণ্ডু সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও দলিল লেখক সমিতির নাম ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়, নানা অজুহাতে হয়রানি এবং ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রিসহ বিভিন্ন দুর্নীতিতে জড়িত। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সাধারণ মানুষের জমির কোনো কাজই হয় না। আদর্শ আন্দুলিয়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাব বলেন, দালাল ছাড়া রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো কাজই হয় না। ৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি জমি রেজিস্ট্রি করতে সরকারি ফি ছাড়াও অন্তত ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। নারায়ণকান্দি গ্রামের লিয়াকত আলী বলেন, শাশুড়ির জমি স্ত্রীর নামে হস্তান্তরের পর বিক্রির সময় কাগজপত্রে নানা ত্রুটির কথা বলে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।


সম্পর্কিত খবর

;