বুলিং ও র‍্যাগিং রোধে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ না-কি সচেতনতা?

প্রকাশ : 10 Jun 2026
বুলিং ও র‍্যাগিং রোধে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ না-কি সচেতনতা?

তাহমিদ জেরিন নুর:

বুলিং ও র‍্যাগিং শব্দদ্বয়ের সাথে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। বুলিং ও র‍্যাগিং হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে শারীরিক বা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া বা হেনস্থা করার আগ্রাসী আচরণ। কাউকে ব্যঙ্গনামে ডাকা, কটু কথা বলা, ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর ও আক্রমণাত্মক আচরণ করাও এক ধরনের বুলিং ও র‍্যাগিং। একক বা দলবদ্ধভাবে সংঘটিত হওয়া এমন পরিস্থিতি ভুক্তভোগীর পক্ষে সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে দুর্বল বা নতুনদের লক্ষ্য করে এই কাজগুলো করা হয়। উভয়ই ভুক্তভোগীর মনে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। শুধু সহপাঠী বা শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকদের দ্বারাও বুলিং ও র‍্যাগিং হতে পারে। অনেকের ধারণা বুলিং ও র‍্যাগিং শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হয়, কিন্তু বর্তমানে অনেক অফিস-আদালতেও এসব হচ্ছে। যারা এ কাজ করে তারা সাধারণত দুর্বল প্রকৃতির মানুষকে বেছে নেয় এবং তাদের শিকার বানায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা প্রমাণ করতে দুর্বল প্রকৃতির মানুষকে হাসির পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। সমাজে বুলিং ও র‍্যাগিং বিষয়টি বর্তমানে চরম আকার ধারণ করছে।


বুলিং (Bullying) হলো এমন এক ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ, যা বারবার করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো, ছোট করা বা তার উপর নিজের ক্ষমতা জাহির করা। বুলিং সাধারণত নিচের রূপগুলো নিতে পারে: ব্যঙ্গ করে নাম ধরে ডাকা, কটুকথা বলা বা উপহাস করা; দল থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া বা গুজব ছড়ানো; ধাক্কা দেওয়া, আঘাত করা বা জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া; ইন্টারনেট বা মেসেজের মাধ্যমে হুমকি দেওয়া বা অপমানজনক তথ্য ছড়ানো।


র‍্যাগিং (Ragging) সাধারণত স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘটে। সিনিয়র বা প্রভাবশালী শিক্ষার্থীরা নবাগত বা জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সাথে এমন আচরণ করে। র‍্যাগিংয়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: পরিচয়পর্ব বা নবীন বরণের নামে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন করা; জুনিয়রদের জোর করে কোনো বিব্রতকর বা অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করা; অপমানজনক অঙ্গভঙ্গি করা বা কুরুচিপূর্ণ কথা বলা।


বুলিং ও র‍্যাগিংয়ের কারণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা একাকীত্ব, বিষণ্ণতা, এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এ ধরনের অপরাধ রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যারা বুলিং ও র‍্যাগিংয়ের শিকার হয় তাদের মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ততা, খিটখিটে মেজাজ এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বুলিং ও র‍্যাগিং প্রতিরোধ না করলে সমাজে গঠনমূলক নেতৃত্ব ও সুনাগরিকের অভাব পরিলক্ষিত হবে।


শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র‍্যাগিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩’ প্রজ্ঞাপন আকারে একই বছরের ২ মে প্রকাশ করে। যা ২৯ জুন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এই নীতিমালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র‍্যাগিং প্রতিরোধে এক বা একাধিক কমিটি গঠন ও গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এর আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিং পর্যবেক্ষণে স্কোয়াড গঠনের নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানিতে একই বছরের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। রুলে শিক্ষার্থীদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় বুলিং ও র‍্যাগিং কার্যক্রম রোধে নীতিমালা প্রণয়নে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, বুলিং ও র‍্যাগিং থেকে শিক্ষার্থীদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদ্ধতি প্রবর্তনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়। শুনানির পর রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট।


এখন প্রশ্ন হলো, আইন প্রণয়নেই কি এ অপরাধ বন্ধ করা যাবে? না কি কঠোর প্রয়োগেরও আবশ্যকতা আছে? এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে?



-লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতক সম্মান (আইন) প্রথম বর্ষ, নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।




সম্পর্কিত খবর

;