মানিক লাল ঘোষ:
দোল পূর্ণিমা বা বসন্তোৎসব বাঙালির জীবনে কেবল রঙের উৎসব নয়, বরং এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলার ঋতুচক্রের শেষ উৎসব বসন্তের এই দোল পূর্ণিমা। একদিকে যেমন এর পেছনে রয়েছে সহস্র বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য, অন্যদিকে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে এর এক মার্জিত ও শৈল্পিক উত্তরণ।
দোল বা হোলি উৎসবের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। হিন্দু পুরাণ মতে, এটি বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লৌকিক মতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকা ও গোপীদের সঙ্গে আবির খেলায় মেতে উঠেছিলেন—সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই দোল উৎসব পালিত হয়। আবার বাংলার বাইরে একে 'হোলি' বলা হয়, যার পেছনে রয়েছে হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকার দহনের কাহিনী, যা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একে 'মদন উৎসব' বা 'বসন্তোৎসব' হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যযুগের কবিদের পদাবলিতেও বসন্তের এই রঙের জোয়ারের বর্ণনা পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দোল উৎসবকে ধর্মীয় গণ্ডি থেকে মুক্ত করে এক বৃহত্তর মানবিক ও প্রাকৃতিক রূপ দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন গৃহকোণ ছেড়ে প্রকৃতির অবারিত রূপের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেয়। ১৯২৩ সালে শান্তিনিকেতনে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বসন্তোৎসব' শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথের কাছে দোল ছিল 'প্রাণের মেলা'। তিনি রঙের চেয়ে গানের সুর এবং নাচের ছন্দে বসন্তকে বরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে হলুদ বসন পরে ছাত্র-ছাত্রীদের নাচের মধ্য দিয়ে যে উৎসবের সূচনা তিনি করেছিলেন, তা আজ বিশ্বভারতীর এক অনন্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বসন্ত কখনো এসেছে রাজার বেশে, কখনো বা নিভৃত বিরহী আত্মার হাহাকার হয়ে। তাঁর বিখ্যাত 'বসন্ত' কবিতায় তিনি প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে অদ্ভুত নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন:
"ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চনফুল,
ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রকুল।
চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়,
বেণুবন মর্মরে দক্ষিণবায়।"
আবার দোলের সেই আবির মাখা আকাশ আর মাটির রূপ দেখে তিনি লিখেছেন:
"আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব ঘন কুন্তল-গন্ধে রে,
উতল সমীরণ দিগন্তরে।
উছলিল অমিয়-তরঙ্গ রে।
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।"
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন যে, দোল কেবল গায়ে কাদা মাখা বা হইহুল্লোড় নয়। এটি হলো মনের ময়লা পরিষ্কার করে হৃদয়ে নতুন রঙের সঞ্চার করা। তাঁর গানে তিনি বারবার বলেছেন—
"আবিরে রাঙাব না কেন, শুধু কি বাহির রাঙাবে? কেন মন রাঙাবে না?"
আজকের যান্ত্রিক পৃথিবীতে দোল পূর্ণিমা যখন কেবল ছুটির দিন বা বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের এই দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে নিজের রুচি ও সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করা যায়।
দোল পূর্ণিমা মানেই ফাল্গুনের পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধ আলো, পলাশের রক্তিম আভা আর বসন্তের উদাস বাতাস। আর এই সবকিছুর মেলবন্ধন ঘটে রবীন্দ্রনাথের সুর ও বাণীতে। বাঙালির কাছে তাই দোল পূর্ণিমা মানেই রবীন্দ্রনাথ, আর রবীন্দ্রনাথ মানেই বসন্তের অবারিত আনন্দধারা।
-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
মোঃ কাওসার হোসেন:বানারীপাড়া প্রেসক্লাবের বহুবার সভাপতি—রাহাদ সুমন। কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনোবা সমঝোতার ভিত্তিতে। এতবার নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর সাংগঠনিক প্রজ্ঞা, মেধা, গ্রহণযোগ্যতা ...
নিকোলাস বিশ্বাস:নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে এমন এক বাস্তবতার কথা গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই: প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এগুলো জাতীয় সীমান্ ...
মোঃ নেছার উদ্দিন:কিছু মানুষের প্রয়াণ কেবল একটি একক জীবনের প্রাকৃতিক সমাপ্তি নির্দেশ করে না; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়, সামাজিক রূপান্তরের ধারা এবং অসংখ্য মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক আশ্রয়ের বি ...
এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ:পরিবারের সুখ-দুঃখ কখনো এর একজন সদস্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের একজন সদস্যের আয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে সবার জীবনে। আবার একটি সন্তান ভালো শিক্ষা পেলে তার সুফলও ভোগ করে প ...
সব মন্তব্য
No Comments