গণসংহতি আন্দোলন

জাতীয় পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনগণের ঐক্য সৃষ্টির লড়াইকে অব্যাহত রাখবে: জোনায়েদ সাকি

প্রকাশ : 01 Aug 2026
জাতীয় পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনগণের ঐক্য সৃষ্টির লড়াইকে অব্যাহত রাখবে: জোনায়েদ সাকি

স্টাফ রিপোর্টার: গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেছেন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মী বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান যে আকাঙ্ক্ষা, জাতীয় পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা—তাকে ধারণ করে জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির লড়াই অব্যাহত রাখবে। 


আজ ৩১ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার বিকালে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর উপলক্ষে জুলাই গণসমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই কথা বলেন তিনি।


“গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তুলুন” এবং “নতুন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হোন” এই আহবান নিয়ে, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই সমাবেশ উদ্বোধন করেন শহীদ জুলফিকার আহমেদ শাকিলের মা আয়েশা বিবি। সমাবেশের শুরুতেই শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয় এবং জিএসএর সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুবরণকারী সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। 


সমাবেশে জোনায়েদ সাকি আরও বলেন, ন্যূনতম জাতীয় ঐক্যমত্য ছাড়া এই পর্যায়ে আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণে যেতে পারব না। কাজেই জনগণ ভোট দিয়ে 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এর যে বাস্তবায়নের ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেই অনুযায়ী যাতে রাজনৈতিক সংস্কার, সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়িত হয়, আমরা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবো।


তিনি বলেন, আজকে সরকারের কাজ করার সুবাদে এই কথা পরিষ্কার আমরা বলতে চাই—প্রথম কথা ছিল এই দেশের শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ যাতে আমাদের এই রাষ্ট্রজীবনে অধিকার আর মর্যাদা পায়। একজন মানুষও যাতে বাইরে না থাকে তার জন্য আমরা কাজ করব।


তিনি আরও বলেন, আমরা জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়েছি, কিন্তু আরেকটা নতুন ফ্যাসিবাদ—যারা ধর্মের বয়ান দিয়ে, নিজস্ব বয়ান দিয়ে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করতে চায়। তারা মানুষকে উত্তেজিত করে পানি ঘোলা করতে চাইছে। সরকার যখন জনআকাঙ্ক্ষা, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করার উদ্যোগ নিচ্ছে, তারা দেশে একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করে একটা ঘোলা পানি তৈরি করতে চাচ্ছে। জনগণকে আজকে সতর্ক থাকতে হবে।


সভাপতির বক্তব্যে জিএসএর প্রধান সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা ৬৯, ৭১, ৯০ ও ২৪ সালে আন্দোলন করেছি। সর্বশেষ ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি দায়িত্ব ছিল—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। ইতিমধ্যে নির্বাচনসহ বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা আশাহত হয়েছি। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার অবিলম্বে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে।


জিএসএর নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, জুলাই বাংলাদেশের মানুষের সামনে যে নতুন সম্ভাবনা হাজির করেছে, সেই সম্ভাবনা হচ্ছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা। বাংলাদেশে এই জুলাইয়ের বহু আগে থেকেই গণসংহতি আন্দোলন একটি নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে আসছে। যে সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই তৈরি হতে পেরেছে, সেই সংগ্রামে জনগণের বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন—গণসংহতি আন্দোলন প্রথম থেকেই সেই কথা বলে এসেছে। বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংস্কার যে প্রয়োজন, সেই কথাও গণসংহতি আন্দোলন বলে এসেছে।


তিনি বলেন, আজকে এই জায়গাগুলোই বাংলাদেশের নতুন বন্দোবস্ত হিসেবে, বাংলাদেশের নতুন পথচলার ভিত্তি হিসেবে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, সার্বভৌম বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিক তার নাগরিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হবেন। প্রতিটি নাগরিক হবেন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। যেখানে সুশাসন থাকবে, যেখানে সমস্ত নাগরিক তাদের অধিকার পাবেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে সব নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে এবং একটি বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।


তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে সমস্ত পেশার মানুষ ছিলেন। সমস্ত ধর্মের মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশে অবস্থিত সমস্ত জাতির মানুষ ছিলেন। সকলের মিলেই এই জুলাই গড়ে তুলেছেন। সকলেই শহীদ হয়েছেন। আজকে এখানে শ্রমিকদের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছেন শ্রমিকরা। এই শ্রমিকরাই বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকে সামনে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে এই শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আমরা লড়াই করে যাব। 


জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, গণসংহতি আন্দোলন ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ফ্যাসিবাদের পতনের ডাক দেওয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, পুলিশের যেকোনো অপরাধের তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে হবে। আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যে আছি। কিন্তু জনগণের পক্ষে থেকে জনগণের কথা বলাই আমাদের কর্তব্য। 


জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, গণঅভ্যুত্থানে রিকশাশ্রমিক, সিএনজিচালক, ফুলবিক্রেতাসহ বহু শ্রমজীবী মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের অনেকের নামও আমরা জানি না। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আরও সাংগঠনিকভাবে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, তরুণ, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি এবং একসঙ্গে কাজ করছি। এই সব মানুষের আকাঙ্ক্ষার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাব। 


জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ রুমী বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে দখল করা ছিল আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ কায়েমের মূলমন্ত্র। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার শহীদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই ইতিহাসের দখল নেওয়ার জন্যও আজ কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই দখলদারিত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফ্যাসিবাদের বীজ। জুলাইয়ের পর নারী ও শ্রমিকদের অবদানকে আড়াল করে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। এই সমস্ত তৎপরতা প্রতিহত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার কাজে আমাদের ভূমিকা নিতে হবে। 


জিএসএর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য মনির উদ্দীন পাপ্পু বলেন, যারা আত্মত্যাগ করলেন, তারাই এই মহান ইতিহাসের নির্মাতা। যারা আত্মত্যাগ করলেন, তারা আসলে কী চান, সেটা আমাদের আলোচনা করতে হবে। তিনি বলেন, এদেশে ৭১-এ মানুষ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এই বাংলাদেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব ৭১ ও ২৪-এর শহীদরা আমাদের দিয়ে গেছেন। লড়াইয়ের নতুন পর্বে এই দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে। 


সমাবেশ সঞ্চালনা করেন জিএসএর ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু, জেন্ডার বিষয়ক সম্পাদক পপি রানী সরকার ও দপ্তর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বাবা হলেন মাহবুবুর রহমান, জিএসএর কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অঞ্জন দাস, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদ শিমুল, রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল রানা, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বাচ্চু ভূঁইয়া, শ্রম খাত বিষয়ক সম্পাদক আলিফ দেওয়ান সহ গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, গণসংগঠন ও জিএসএর নেতৃবৃন্দ।

সম্পর্কিত খবর

;